কেমন ছিলেন হাফিজ মাওলানা সৈয়দ মুতিউর রহমান রহ.

কেমন ছিলেন হাফিজ মাওলানা সৈয়দ মুতিউর রহমান রহ.
   
ঐতিহ্যবাহী সৈয়দপুর হাফিজিয়া হুসাইনিয়া আরবিয়া দারুল হাদীছ টাইটেল মাদ্রাসার দীর্ঘ ২৮ বৎসরের সফল মুহতামিম হাফিজ মাওঃ সৈয়দ মুতিউর রহমান রহ. এর স্বরণে স্বারক..
:
লেখক : হাফিজ শফিকুল ইসলাম শফিক
শিক্ষার্থী : জামেয়া সৈয়দপুর, জগন্নাথপুর,সুনামগঞ্জ, সিলেট।
প্রকাশকাল : এপ্রিল ২০১৭ ইংরেজি। 
:
পর্ব-০১
আমি যখন হেদায়াতুন্নাহুতে  পড়তাম। 
তখন হেদায়াতুন্নাহুতে  হুজুর নুরুল ঈযাহ কিতাব পড়াতেন।  আগের মুহতামিম সাহেব হুজুরের ন্যায় তিনিও নুরুল ঈযাহ পড়ানোর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
হুজুরের দরস ছিলো ৩য় ঘন্টায়।  হুজুর প্রতিদিন এসে একজনকে বলতেন  ইবারত পড়তে,এবং ইবারতে কোন শব্দে কেন যের যবর পেশ এসেছে তা জানতে চাইতেন।
ছাত্ররা যথাসম্ভব বলত এবং যেটা বলতে পারতোনা সেটা হুজুর বলে দিতেন এবং এ বিষয়ে অনেক শাসাতেন,অনেক কাঁদাতেন, এবং অনেক হাসাতেন।  তবে সব কিছুতেই শিক্ষা নিহিত যদি জ্ঞানিরা খুঁজে ।  
হেদায়াতুন্নাহু জামাত মাদ্রাসার দক্ষিণ বিল্ডিংয়ের পূর্ব কোনায় শেষ মাথায় সিরির পার্শ্বে ।
তিনি ক্লাসে এমন ভাবে বসতেন যে, সেখান থেকে সারা মাদ্রাসা এক নজরে দেখা যেত। 
তার সাথে সাথে কে কী  করছেন, কোথায় যাচ্ছেন,কখন আসছেন,সবই সেখান থেকে পুরোপুরি  অবলোকন করতেন।
তিনি সরলমনা ছিলেন তবে  খুব রাগীও ছিলেন বটে। রাগের সময় সবাই হুজুরের কাছ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করতেন। আর ছাত্ররা তো ধারই ভিড়তে পারতো না, তবে হুজুর যাকে আশ্রয় দিতেন, সে প্রশ্রয় পেতো এবং অধিক স্নেহ মমতা পেত। যেদিন মাদ্রাসার ক্লাসে ক্লাসে ঘোরাফেরা  করতেন তখন মনে হতো ছাত্ররা ক্লাসে বসেও যেন কাঁপতেছে। যেদিন যাকে উত্তম মাধ্যম দিতেন সেই বুঝতে পারতো হুজুরের রাগ এবং শক্তি কতটুকু বৃদ্ধ বয়সেও শরীরে রয়ে গেছে। হুজুর কারো মুখ চিনে কথা বলতেন না,লোকটি কত বড় মানুষ তা হুজুর কখনো ভাবতেন না,হক্ব কথা সরাসরি বলে ফেলতেন কাউকে ভয় করতেন না। যারাই হুজুরের অজান্তে হুজুরের বিরুদ্ধে কথা বলতো তারাই হুজুরের সামনে এসে মুখ বন্ধ করে ঠিকই মাথা নিচু করে বসে থাকতো,আর ভয়ে শুধু জ্বিহ হুজুর জ্বিহ হুজুর বলতো।
হুজুরের  সাথে কথা বলা খুব ভয়ের ব্যাপার ছিলো সবাই হুজুরের সাথে কথা বলবে এরকম আশা অনেকেই হয়তো কল্পনাতেও করত না।কিন্তু যে তাঁর সাথে সাহস করে কথা বলতে পারতো তার সাথে হুজুরও কথা বলতেন।এবং তাকে কাছে নিতেন অনেক সময় কথা বলতেন।  হুজুরের সাথে আমি প্রায় ক্লাসে এবং ক্লাসের বাহিরেও অনেক সময় আলাপ করতাম। হুজুর আমাকে খুব মহব্বত করতেন, সহযোগিতা করতেন,সাহস যোগাতেন। দুঃখ, কষ্ট,সুখ,পারিবারিক, সামাজিক,এবং ব্যক্তিগত অনেক কিছুই হুজুর আমার সাথে শেয়ার করতেন আমিও আমার ব্যক্তিগত, পারিবারিক অনেক কিছু হুজুরের সাথে শেয়ার করতাম হুজুর আমাকে বুঝাতেন সান্ত্বনা দিতেন প্রেরণা যোগাতেন।
:
পর্ব-০২
হুজুর যখন ক্লাসে আসতেন তখন প্রায়। চহাত্রদেরকে তার বাড়ি এবং মা বাবা'র অবস্থা সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করতেন।
কে কিভাবে জীবন যাপন করছে,বাড়িতে মা বাবা ভাই বোন কিভাবে দিন কাল পাড় করছেন।বাড়িতে গেলে মা বাবার সাথে কাজ কর্মে সহযোগিতা করি কী করিনা,সহযোগিতা না করলে সহযোগিতা করার জন্য খুব তাকিদ দিতেন। 
এবং মা বাবার খেদমত করার জন্য নসিহত করতেন। তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করা,এবং তাঁদেরকে সর্বদা খুশি রাখতে তাগিদ দিতেন।
এবং বলতেন বাবারা মন দিয়ে পড়া লেখা করে বড় আলিম হও,এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি করোনা,তোমাদের মাথা পিতা অনেক আশা করে তোমাদেরকে মাদ্রাসায় দিয়েছেন যাতে পড়া লেখা করে বড় আলিম হও, এবং তাদের ইন্তেকালের পর তোমরা জানাযা পড়াও,তোমরা পড়ালেখায় মনোযোগী হও,নিয়মিত ক্লাস করিও,ক্লাস না করে পলায়ন করোনা,জানো তোমাদের মাথা পিতা তোমাদেরকে কোন কাজে না দিয়ে তোমাদেরকে পড়া লেখায় দিয়েছেন। চাহিলে তারা তোমাদেরকে আলিয়া স্কুলে পড়াইয়া দুনিয়ার ধন সম্পদ  অর্জন করার একটা মাধ্যম তৈরি করতে পারতেন।  
কিন্তু তারা তা না করে তোমাকে আল্লাহর রাস্তায় ক্বওমি মাদ্রাসায় দিয়েছেন একমাত্র আল্লাহকে পাওয়ার জন্য অন্য কিছুর জন্যে নয়। তারা তোমাকে প্রয়োজন অনুমাতে কষ্ট করে হলেও টাকা যোগান করে তোমাদের জন্য পাঠিয়ে দেন,তোমরা তাদের আশা ভেঙোনা।  
এবং যে ছাত্র পড়া লেখা পাশাপাশি বাপ ভাইয়ের সাথে ক্ষেত খামারে সহযোগিতা করত তাদেরকে খুব মহব্বত করতেন।
আমি আমার ভাইদের সাথে ব্যবসায় মাঝে মধ্যে সময় দিতে বলতেন এবং যখন তিনি দেখতেন আমি ভাইদের সাথে ব্যবসা করছি তখন খুব খুশি হতেন,এমনকি আমি যে কোন সময়  ভাইদেরকে  সহযোগিতা করার জন্য ছুটি ছিলো উন্মুক্ত।  হুজুর বলতেন মানুষের কাছে হাত পাতানো থেকে বিরত থেক এবং  কষ্ট করে হলেও উপার্জন করে আহার করিও।
কোন কাজ হলেই হুজুর শফিক বলে ডাক দিতেন অথবা কল দিতেন,ঔষধ , কারেন্ট বিল,গ্যাসের সিলিন্ডার ইত্যাদি কাজে হজুর  অধমকে তলব করতেন,হুজুরের যে কোন আদেশকে মাথা পেতে স্বাচ্ছন্দে গ্রহণ করতাম। তখন মনে করতাম আমার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বার্থকথা হচ্ছে হুজুরের আদেশ পালন করা,এখনো ইনশাআল্লাহ প্রত্যেক উস্তাদকে নিজের মনিব মনে করি,আমি তাদের নগণ্য গোলাম হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করি। হুজুর আমার মাখদুম ও ছিলেন মাশুক্বও ছিলেন,এই জন্যে হয়তো হুজুর আমাকে ফানা ফিশ শায়েখ উপাধিতে ভূষিত করেন কিন্তু আমি তার একটুও যোগ্যতা রাখিনা যোগ্যও না। 
আজ হুজুর দুনিয়ায় নাই হুজুরের স্মৃতি হুজুরের কথা আমাকে এবং জামেয়ার প্রত্যকটা ছাত্রকে কাঁদায়।
হুজুরের মুবাইল নাম্বার এখনো আমার মুবাইলে বিদ্যমান থাকলেও হুজুর এই নশ্বর ধরাতে বিদ্যমান নাই।
:
পর্ব-০৩
:

মেধাবী ছাত্রদের জন্য হুজুরের আলাদা মহব্বত ছিলো।  প্রতিদিনই একবার হলেও উনার পরিচিত কয়েকজন মেধাবীর মধ্যে কারো না  কারো প্রশংসা করতেন।
হুজুরের খুব প্রিয় একজন ছাত্র ছিলেন হা.মাও.ছাইম আহমদ তিনি এখন দেওবন্দে পড়েন, এবং আমাদের মাদ্রাসায় সুনামের সাথে সরফ জামাত থেকে মুখতাসার জামাত পর্যন্ত পড়া লেখা করেন,তারপর মাদ্রাসার আসাতিযাগণের আদেশ নিয়ে প্রথমে বসুন্ধরা তারপর ঢালকানগর অতঃপর দেওবন্দ চলে যান। হুজুর যে কোন প্রশ্ন তাকে করলে তিনি সাথে সাথে জওয়াব দিতে পারতেন,মুলত হুজুরের মহব্বতটা ছিলো সেই জন্যই। আমাদেরকে পড়া লেখার বিষয়ে কোন উদাহরণ দিতে চাইলে, বলতেন আমার ছাইম ঠিক আছে,আমার ছায়েমের মত তোমরা হতে পারবেনা। মাঝে মাঝে ছাইম ভাই হুজুরের কাছে ফোন দিয়ে হুজুরের হাল অবস্থা জানতেন। এই জন্য প্রায় বলতেন, দেখ আমার ছাইম বসুন্ধরা দুইশত ছাত্রের মধ্যে এক নাম্বার হয়েছে সে সত্যিকার একজন মেধাবী ছাত্র।
(হুজুর আপনার মতের সাথে আমরাও সহমত পোষণ করতেছি হে আপনার ছাইম সত্যিকার একজন মেধাবী ছাত্র)
হুজুর আপনে যেভাবে মহব্বত করতেন, তিনিও আপনার মহব্বতের মুল্য একটু হলেও জীবিতবস্থায় এবং মরনের পরে দিয়েছেন আরো দিবেন ইনশাআল্লাহ।
আপনার মরনের খবর শুনে তিনি হয়তো অনেক কেঁদেছেন কিন্তু জানাযায় আসার সুযোগ হয়নি,কিন্তু তিনি আপনার জন্য দারুল উলুম দেওবন্দে আওলাদে রাসুলের থেকে দুয়া করিয়েছেন আর এটাই হচ্ছে প্রকৃত মহব্বত আর তিনিও ইনশাআল্লাহ অবিরাম আপনার দরযা বুলন্দ হওয়ার জন্য দুয়া করতেছেন আমরাও দুয়া করছি এবং মুহিব্বিন এবং মুতায়াল্লিকিন সবাই দুয়া করছে।
আল্লাহপাক আপনার দরজা অনেক উচু করুক,আমিন।
:
পর্ব-০৪
এভাবে হুজুরের অত্যন্ত মহব্বতের ছাত্র ছিলেন, হা.মাও.শাহ নেওয়াজ যিনি দীর্ঘদিন আমাদের মাদ্রাসায় অত্যন্ত সুনামের সাথে পড়া লেখা করে অতঃপর হাটহাজারীতে চলে যান,এখনো তিনি হাটহাজারীতে অধ্যয়নরত আছেন।
হুজুরের সাথে ভাইয়ের দ্বীনি সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ছিলো,ছাত্র হিসেবে মেধাবী এবং চরিত্রের দিক দিয়ে অন্যান্যদের তুলনায় অনেক উর্ধ্বে  এই জন্য ভাইটিকে খুব মহব্বত করতেন।  হুজুর উনাকে কয়েকটি কিতাবও দিয়েছেন মুতাওয়ালা করার জন্য।  হুজুরের বাড়ির কাছে উনার লজিং ছিলো তাই প্রায় প্রতিদিনই উনি হুজুরের খেদমতে হাজির হতেন।  হুজুর উনিকে নিজের আস্থাভাজন লোক হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন বলে হুজুরের জীবনের সর্বশেষ মাদ্রাসার জলছার রাতটি হুজুরের সাথে হুজুরের কামরায় কাটিয়েছেন।
হুজুরের সাথে উনার প্রায় ফোনে আলাপ হতো, হুজুরও উনাকে মাঝে মধ্যে কল দিতেন উনিও প্রায়শ হুজুরের খোজ খবর নিতেন।
যেদিন হুজুরের ইন্তেকাল হয় আমি সাথে সাথে উনাকে কল দেই,কিন্তু রিসিভ না করতে পারলেও কিছুক্ষণের ভিতরে খবর পেয়ে অতঃপর কল রিপ্লাই করছিলেন তখন তিনি খুব ভারাক্রান্ত হৃদয়ে কথা বলেছিলেন।
উনি হুজুরের জানাযায় আসার জন্যে খুব চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু সময় এবং ট্রেন কিংবা গাড়ীর টিকেট পেতে ভোগান্তি বোধ করেছিলেন, টিকেট পেলেও হুজুরের জানাযায় শরিক হতে পারবেন না বলেই আর উনার আসা হয়নি।
তবে হুজুরের ইন্তেকালে খুব কেঁদেছিলেন হয়তো।
পরের দিন উনিও হাটহাজারী দারুল হাদীছে আল্লামা জুনাঈদ বাবুনগরী থেকে হুজুরের মাগফিরাতের জন্য হাজার হাজার উলামাদেরকে নিয়ে দুয়া করেন।  
মাদ্রাসার জলছায় যখন ভাই আসলেন, যখন মুহতামিম সাহেবের রুমে আসলেন, তখন আমি খুব মিনতি করে বললাম ভাই বসেন একটা চা খান অথবা আপেল আঙুর খান, নাহ উনি কিছুই খেলেন না।  আমার ধারনা সম্ভবত হুজুরের রুমে এসে ভাইটি অত্যন্ত ব্যতিত দুঃখিত হয়ে যান,হুজুরের জিনিস পত্র,বই পুস্তক দেখে হৃদয় নড়বড় হয়ে যায়,তাই সাথে সাথে বেশি সময় ব্যয় না করে চলে যান।
সত্যি এমন অবস্থা আমারও হয়েছিলো। হুজুরের ইন্তেকালের পর অনেক সংঘটন এবং অনেক দলের মানুষ হুজুরের জীবনালোচনা করেছিলেন, আমি অনেক জায়গায় দাওয়াত পাওয়ার পরও যাইনি,কারন হুজুর দুনিয়াতে নেই কথাটা শুনলেই নেত্রজলে গাল ভিজে যায়, হুজুর দুনিয়াতে নেই এই কথা আমার সহ্য হয়না।
মুলত না যাওয়ার এটাই কারণ।
তবে হে সেদিন আমিও বাড়িতে বসে বসে হুজুরের জন্য ঈসালে সাওয়াব করেছি এবং এখনো হুজুরের কথা স্বরন হলে কমপক্ষে তিনবার সুরায়ে ইখলাস পড়ে হুজুরের মাগফিরাত কামনা করে দরজা বুলন্দে কাকুতি করি।
আল্লাহপাক হুজুরকে জান্নাতের আ'লা ইল্লিন দান করুন,এবংবং আমাদেরকে তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করার তাউফিক দান করুন,আমীন
:
পর্ব-০৫
তখন আমি মক্তব ছুওমে পড়ি,আমাদের সাথে নতুন একটা ছাত্র ভর্তি হয়েছে,বয়স একটু বেশি সম্ভবত আগে স্কুলে ছিলো। তারপর ইচ্ছে হয়েছে মাদ্রাসায় পড়ার তাই চলে এসেছে।  উর্দূতে দূর্বল ছিলো বলেই তাকে মক্তব ছুওমে ভর্তি করা হয় তার নাম হেলাল এখন হাটহাজারীতে দাওরায় পড়েন। মক্তব ছুওমে তিন মাস পড়ে মক্তব পাঞ্জমে চলে যান। এবং কয়েক বছর  আমাদের মাদ্রাসায় পড়েন। এই কয়েক বছরে তাকে দেখলাম হযরত মুহতামিম সাহেবের সাথে কী গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলে,মুহতামিম সাহেবের অন্তরে সে এমনভাবে জায়গা করে নিয়েছিলো যে মুহতামিম সাহেব হুজুর হেলাল ছাড়া বুঝতেনই না,শুধু আমার হেলাল আমার হেলাল বলতেন। হেলাল ভাইও মুহতামিম সাহেবের জন্য এমন আশিক্ব হয়েছিলো যে মুহতামিম সাহেবের প্রত্যেকটি কাজ ঘরোয়া হউক অথবা প্রাতিষ্ঠানিক সব কাজে হেলাল ভাই আগে ঝাপিয়ে পড়তেন।  নিশ্চয় মুহতামিম সাহেব হুজুরের কাছ থেকে মায়া এবং আদর পেয়েছেন বলেই এমনটা হয়েছে। হেলাল ভাই যখনই হাটহাজারী থেকে বাড়িতে আসতেন তখন আমাদের এদিক হয়ে বাড়িতে যেতেন দেখা করে যেতেন শ্রদ্ধেয় মাশুক্ব হযরত মুহতামিম সাহেব হুজুরকে।  কিন্তু মুহতামিম সাহেবের ইন্তেকালের খবর তিনি সাথে সাথে শুনতে পেলেও জানাযায় হাজির হতে পারেন নি, কিন্তু কেঁদেছেন অনেক ব্যতিত হৃদয়ে  গড়ে পড়েছে চোখের নোনাজল।  হেলাল ভাই বা'আদবের পাশাপাশি বা'আমল একজন আলিমও বটে। ফরজের পাশাপাশি নফলের পাবন্দিও অনেক, একরামুল মুসলিমিনের গুণটি তার কাছ খুবই বিদ্যমান।
হুজুরের ইন্তেকালের পর একবার এসেছিলেন। জেয়ারত করার পর, আমার সাথে দেখা হয়েছিলো হুজুর সম্বন্ধে অনেক কিছু বললেন এবং দুয়াও করলেন। আমি বললাম ভাই আপনাকে হুজুর অনেক মহব্বত করতেন, খাস করে আপনে হুজুরের জন্য দুয়া করবেন। সে বলল ভাই হুজুর তো হুজুরের বুঝ করে চলে গেছেন হুজুর তো জান্নাতি ইনশাআল্লাহ, হুজুরের কাছে থাকতেন হয়তো এই জন্য এই কথা বলেছেন।
আল্লাহপাক যেন হুজুরকে জান্নাতের উঁচু মাক্বাম দান করেন।আমিন
:
পর্ব-০৬

.
হযরত মুহতামিম সাহেব হুজুর রহ.অত্যন্ত সাদা মনের মানুষ ছিলেন। যে কারো কথা কোন প্রকার যাচাই ছাড়া বিশ্বাস করে ফেলতেন,কিন্তু লোক সমাজে বলে বেড়াতেন না,তিনি হয়তো মনে করতেন একজন মুসলমান, এবং একজন আলেম, একজন হাফেজ হয়ে কী
মিথ্যা বলতে পারে,আগের যুগের আলিম তো তাই সব কিছুকে আগের যুগের মত দেখতেন,তিনি হয়তো পরিপূর্ণ ভাবে জানতেন না আগের যুগের কিছুই এখন আগের মত না এখন সব কিছুতে ফরমালিন, আগের যুগে দামি কাপড় না
পড়তে পারলেও তার চরিত্র ছিলো অনেকদামী,আর এখন যুগের মানুষেরা দামী কাপড় পড়লেও তার চরিত্রটা নাম্বার ছাড়া নিকৃষ্ট তা হয়তো হুজুর জানতেন না তাই
অল্পতেই কাউকে বিশ্বাস করে ফেলতেন,তার একটি উদাহরণ হলো : হুজুর একজন মানুষকে কী জন্যে যেন কিছু টাকা দিয়েছিলেন পরে সেই ব্যক্তি হুজুরকে না বলেই
এই টাকা দিয়ে জমি খরিদ করে হুজুরের টাকা আত্মসাৎ করার ইচ্ছে করেছিলো,কিন্তু হুজুর তা জানতে পেরে তার গ্রামের মুরুব্বিদের মাধ্যমে হুজুর সেই টাকা উদ্ধার করতে সচেষ্ট হোন। হুজুরের সাদা মনের বাস্তব অনেক নমুনা আমার দেখা অনেক জানা এগুলো লেখার মত না। দুয়া করি আল্লাহপাক রাব্বুল ইজ্জত যেন হুজুরের সাথেও সহজ সরল ব্যবহার করেন,আমিন
:
পর্ব-০৭
হযরত মুহতামিম সাহেব হুজুর রহ.সাদাসিধে জীবন যাপন করতেন।  অন্তরে কোন অহংকারের ছিটেফোঁটা ছিলোনা। ঢিলেঢালা জামা পরিধান করতেন। এক কালার জামা পরিধান করতেন। রাস্তায় যখন হাটতেন তখন নরম দিলে আস্তে আস্তে হাটতেন কোন  তাড়াহুড়া করতেন না।   নিজেকে গোপন রাখতেন ইলিম এবং আমল এবং বংশ এমনকি এত সম্পদের মালিক থাকার পরেও কোন প্রকার অহংকার করতেন না।  নিজেকে মানুষের কাছে  বড় হিসেবে প্রকাশ করতেন না। সব সময় নিজেকে গোপন রাখার চেষ্টা করতেন।অনেক জায়গা থেকে হুজুরকে আমন্ত্রণ করা হত কিন্তু হুজুর যেতেন না। হুজুর সব সময় নিরিবিলি পরিবেশ পছন্দ  করতেন।  জঞ্জালাদি কোন কিছুই পছন্দ করতেন না। ফিৎনা ফাসাদ থেকে নিজেকে সব সময় হেফাজত রাখার চেষ্টা করতেন ।  হুজুর  সব সময় মরনের কথা স্বরন করতেন।  দুনিয়াকে সব সময় তাচ্ছিল্য মনে করতেন। টাকা পয়সা গাড়ি বাড়ী অনেক কিছুর মালিক হবেন সেদিকে কোন খেয়ালই ছিলনা। 
বলতেন বাবা এখন আমার যে বয়স মরনের বয়স নবীজীর হাদীছ অনুযায়ী আমার জীবনের শেষ সময় পাড় করছি,এখন যে বয়সটুকু পেয়েছি এগুলো বোনাস।  বলতাম হুজুর আমরা আপনার জন্য দুয়া করি সব সময় আল্লাহ যেন আপনাকে নেক হায়াত দান করেন।
হুজুর বলতেন দুয়া করিও আল্লাহ যেন ঈমানের হালতে মরন দান করেন। আজ হুজুর নাই দুনিয়া থেকে চলে গেছেন,কিন্তু রেখে গেছেন হুজুরের কত স্মৃতি এবং কত কথা।
:
পর্ব-০৮
হযরত মুহতামিম সাহেব হুজুর রহ.এর দুনিয়ার কোন কিছুর প্রতি লোভ ছিলো বলে আমি কোনদিন অনুধাবন করতে পারিনি।  তবে দুনিয়ার জিনিসের প্রতি যে লোভ ছিলোনা তা আমি অনেক অনুধাবন করেছি। টাকার প্রতি হুজুরের কোন লোভ ছিলোনা ব্যাংকে টাকা জমা করবেন এরকম কোন চিন্তাই ছিলোনা হুজুরের। এই জন্যেই তো একবার ব্যাংকে টাকা রেখেছিলেন, অতঃপর যখন অনেকদিন  পর টাকা উঠাতে গেলেন এবং জানতে পারলেন হুজুরের টাকা বহুদিন জমা থাকার কারনে প্রায় দশ হাজারের মত সুদ বেরে গেছে সেই দিন যে হুজুর নিজের টাকা উঠিয়ে এনেছিলেন সেদিন থেকে আর ব্যাংকে টাকা জমা রাখেন নি,তারপর থেকে বালিশের নিচে অথবা কিতাবের একেবারে নিচে টাকা রাখতেন বলা বাহুল্য কিতাবের ভিতরে নয়। আমি প্রায় হুজুরের খরচ করার জন্য টাকা আনতাম,তখন হুজুর হয়তো বালিশের নিচ থেকে নয়তো পকেট থেকে অথবা কিতাবের নিচ থেকে টাকা দিতেন। ব্যাংকের এই ঘটনা হুজুর আমাকে নিজে বলেছেন। হুজুরের ছেলে মেয়ে, বাতিজা বাতিজী এবং আত্মীয় সজনরা বিদেশ থেকে হুজুরকে টাকা পাঠালে, তা হুজুর পিন নাম্বার অথবা অন্য কোন মাধ্যমে সংগ্রহ করতেন। হুজুর একবার লন্ডনে বেড়াতে গিয়েছিলেন কিন্তু সেখানে বেশিদিন থাকেন নি,লন্ডনের পরিবেশ হুজুরের কাছে এত খারাপ লেগেছিলো যে জীবনে আর লন্ডনে না যাওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন।
অনেকেই লন্ডন থেকে আসতে চাননা অথবা মাদ্রাসার কাজে গেলে নিজের পকেটও বুজাই করেন। কিন্তু হুজুর কখনো এসবের মুখাপেক্ষী ছিলেন না।
আজ হুজুর নাই কিন্তু হুজুরের মত একজন মানুষও এ ধরাতে নাই। আজ সবার মুখে শুধু হুজুরের গুণগান। 
:
পর্ব-০৯
হযরত মুহতামিম সাহেব হুজুর রহ.ছিলেন একজন খাটি আমানতদার।  আমানতদারিতা ছিলো হুজুরের সবচেয়ে বড় গুণ। আমানতদারিতে তিনি ছিলেন অটল প্রাচিরের মত শক্ত।   কখনো আমানতদারী থেকে এক চুল পরিমাণও পিছপা হতেন না।  কখনো হুজুরকে কোন মানুষ আমানতে একটুও এদিক সেদিক হতে দেখেন নি। আমাদের গ্রামের আবাল বৃদ্ধ বনিতা এবং বাহিরের পরিচিত সবাই হুজুরের আমানতের বিরাট এই গুণ সম্বন্ধে পরিজ্ঞাত।  হুজুরকে হারানোর সাথে সাথে পৃথিবী হারালো খাটি একজন আমানতদার মুখলেস আলিমে দ্বীনকে।  হুজুরের শেষ জীবনের মাদ্রাসার  মাহফিলে নিজের কামরায় কয়েকজন মেহমানকে  নিয়ে বসে  আলাপ আলোচনায় ব্যস্ত।   এমতাবস্থায় জলছার চাঁদা লেখার দায়িত্বে নিয়জিত ক্বারী মাওঃ দিলওয়ার সাহেব আমাকে ডেকে বললেন, যাও মুহতামিম সাহেবের রুম থেকে ট্যাংকের টাকা খালি করে খালি ট্যাংক নিয়ে আস। আমি হুজুরের কথা মত গেলাম মুহতামিম সাহেবের রুমে গিয়ে হুজুরকে বললাম, হুজুর ক্বারী সাহেব হুজুর পাঠিয়েছেন ট্যাংক খালি করে নেওয়ার জন্য হুজুর ছিলেন খুবই রাগান্বিত। তখন সাথে সাথে হুজুর আমাকে ধমক দিয়ে বললেন বের হয়ে যাও কে বলেছে ট্যাংক নেওয়ার জন্য।  
আমি বললাম ক্বারি সাহেব হুজুর বলেছেন।
তারপর আমি বের হয়ে আসলাম মনে মনে ভাবলাম এত গভীর সম্পর্কের মধ্যে হুজুর এমন আচরণ করলেন।  তখন যদিও খুব খারাপ লেগেছিলো কিন্তু পরে বুঝতে পেরেছি যে হুজুর এভাবে কথা বলার কথা না, নিশ্চয় মাদ্রাসার স্বার্থে এবং আমানত রক্ষা করার জন্য এবং বাকি টাকা কোথায় রাখবেন সে দিকে লক্ষ্য করে হয়তো এমন আচরণ করেছেন।  হুজুরের কথা তিক্ত হলেও অনেক পর হলেও এর ফলাফল পেয়েছি এবং আজ হুজুর দুনিয়াতে নাই হুজুরের অনেক কথার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে......
:
পর্ব-১০
হুজুর যেভাবে টাকা পয়সার আমানতদার ছিলেন।  তেমনিভাবে মানুষের গোপনীয় কথার এবং কাজেরও আমানতদার ছিলেন।  মানুষের গীবত, শেকায়াত,এসব পছন্দ করতেন না।  কারো কাছ থেকে কোন কিছু বাকিতে ক্রয় করলে খুব তাড়াতাড়ি পরিশোধ করার চেষ্টা করতেন।  তবে সবার কাছ থেকে বাকি খরিদ করতেন না।  
মাদ্রাসায় কেউ টাকা দিলে হুজুর তৎক্ষণাৎ ক্যাশিয়ার সাহেব মাওঃ সৈয়দ  মাসরুর আহমদ কাশেমি সাহেবের কাছে দিয়ে দিতেন। কখনো মাদ্রাসার টাকা নিজের কাছে রাখতেন না।  একদিন আমার কাছে আমার তারাবিহ'র সাথী ভাই হা: শেখ ছাবির আহমদ এক হাজার টাকা দিলো মাদ্রাসায় দেওয়ার জন্য,আমি হুজুরের কাছে নিয়ে গেলাম এবং চলে আসতাম এমন সময় হুজুর বললেন দাঁড়াও এই টাকাটা কে দিয়েছে আমি বললাম  আমার মসজিদের বাড়ির এক ছেলে দিয়েছে। বললেন তার নাম কি?  এবং কোন ফান্ড দিয়েছে? আমি বললাম তার নাম ছাবির,জেনারেল ফান্ডে দিয়েছে।  বললেন রশিদ নিয়ে যাও,তারপর হুজুর রশিদ নিজে লিখে আমাকে একটা দিয়ে টাকাটা রাখলেন।  হুজুর চাহিলে রশিদ না দিয়েও টাকা  রাখতে পারতেন।  কিন্তু তা করলেন না কেন?  হয়তো ভেবেছেন এই টাকাটা মাদ্রাসার, আমার ভুল যেতে পারে তাই হুজুর এমনটা করেছেন। হুজুরের কাছে মাদ্রাসার নামে এক লক্ষ টাকা এসেছিলো মাদ্রাসায়, হুজুর রাত্রে উনার একাউন্টের চেক বই নিয়ে মাদ্রাসায় এসে ক্যাশিয়ার হুজুরের কাছে দিলেন।  তখন ক্যাশিয়ার হুজুর বললেন হুজুর রাত্রে নিয়ে আসার কি প্রয়োজন ছিলো দিনে মাদ্রাসায় আসার সময় নিয়ে আসতে পারতেন।  হুজুর বললেন আমি চিন্তা করলাম যদি আমি রাত্রে মরে যাই,আর এই চেক বইটা রেখে যাই,তাহলে আমার ইন্তেকালের পর হয়তো এই টাকাটা মাদ্রাসায় নাও পেতে পারে কেউ বাজেয়াপ্ত করে ফেলবে,আর আমি পরকালে মাওলার দরবারে জবাবদিহি করতে হবে,তাই আমি এখনই নিয়ে আসলাম।
আল্লাহু আকবার কি ভয় ছিলো হুজুরের আল্লাহকে, এবং আমানতদারীতে কি অটল আর অবিচল ছিলেন এবং লেনদেনে কি পরিষ্কার ছিলেন তা এখন আমরা তিলেতিলে শিরায় উপশিরায় টের পাচ্ছি।হুজুর শূন্যস্থান কখনো পূরণ হওয়ার নয়।
এই যমানায় এরকম একজন বুজুর্গ মিলানো খুব কঠিন ব্যাপার।
:
পর্ব-১১
খাওয়া দাওয়া ছিলো পরিমাণ মত।  বেশিও খেতেন না কমও খেতেন না । নবীর সুন্নত অনুযায়ী খাওয়া দাওয়া করতেন ।  খাওয়া দাওয়া কন্টলে ছিলো বলেই বয়স সত্তরের উপরে হওয়ার পরে একটুও শরীর ভাঙেনি। স্বাস্থ্য ছিলো নরমাল এত বেশি স্বাস্থ্য ছিলোনা যে শরীরে অশান্তি ভোগ করতেন।  শরীর চছিলো মজবুত এবং চেহারা ছিলো ফর্সা, মুখের অবয়ব  ছিলো গোল এবং নাক ছিলো ছুরির মত ধারালো, ধবধবে সাদা দাঁত ছিলো যখন হাসি দিতেন প্রাণ জুড়িয়ে যেত,ইন্তেকাল পর্যন্ত মুখের সবকটি দাঁত বিদ্যমান ছিলো। চুল ছিলো একেবারে খাটু। বেশির ভাগ সময়ই মাথার চুল মুণ্ডিয়ে রাখতেন।  মুখের ভাষা ছিলো নরম এবং গরম যেখানে যে ভাষা ব্যবহারের প্রয়োজন হত সেখানে সেই ভাষা ব্যবহার করতেন।
কিছু খেলে অল্প খেতেন অবশিষ্ট খাদ্য কাছের কেউ অথবা দূর থেকে ডেকে কাউকে খেতে দিতেন।  আমি হুজুরকে প্রায় সময় চা খাওয়ানোর দায়িত্ব বহন করতাম, হুজুর চা অল্প  পান করে প্রায় সময় বাকিটুকু আমাকে পান করতে দিয়ে দিতেন।  একদিনের ঘটনা একদিন হুজুর বডিংসুপার সাহেবের রুমে নাস্তা করছেন। এমতাবস্থায় দেখলেন একটা ছাত্র রুমের সামন দিয়ে যাচ্ছে,তৎক্ষণাৎ হুজুর ছাত্রকে ডাকলেন এবং বললেন তুমি কোন  ক্লাসে পড়?  সে ভয়ে কাঁপছে আর বলছে মুখতাসারে পড়ি। বললেন এত ছোট বাচ্চা মুখতাসারে পড়!  বেটা তো কম না!  নাও এই আখনিটুকু খাও। তারপর সে আখনি খেলো,। ছাত্ররা হুজুরকে এত বেশি ভয় পেত যে,হুজুরকে একদিকে দেখলে ছাত্ররা অন্যদিকে যেত।  কিন্তু মাঝে মধ্যে ছাত্ররা যখন  হুজুরের ধার ভিড়তে পারতো,তখন মায়া স্নেহ পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যেত।  এই আনন্দটুকু যদিও হুজুর থাকাবস্থায় প্রকাশ পায়নি,কিন্তু হুজুরের ইন্তেকালের পর বিভিন্ন ছাত্রদের অনুভূতি জানতে পেরে বুঝা গেছে, কার কতটুকু মহব্বত ছিলো  হুজুরের জন্য।  
ছাত্রদের মহব্বত হুজুরের ইন্তেকালের পর দেখা গেছে, হায় ছাত্রদের কান্না আর আহাজারি সেদিন মাদ্রাসা ভারী করে তুলেছিলো। আর একেকজন ছাত্র, হুজুরের একেকটা গুণ প্রকাশ করতে থাকলো,আর আফসোস করতে থাকলো।
:
পর্ব-১২
হুজুর নিজের কাজ নিজে করতে ভালবাসতেন।  সব সময় নিজেকে কামে কাজে অথবা কিতাব মুতাওলায় ব্যস্ত থাকতেন।
মাঝে মাঝে লাকড়ি কাটতেন। নিজের কাপড় নিজে ধোঁয়ে দিতেন। 
কয়েক বছর নিজ বাড়ির পাঞ্জেগার মসজিদে ইমামতি করেছেন। কিন্তু ইমামতির বেতন মুয়াজ্জিনকে দিয়ে দিতেন। সে মাদ্রাসার ছাত্র ছিলো। হুজুর কোন প্রকার অপচয় করা ভালবাসতেন না।  হিসাব করে খরচ করতেন।  প্রয়োজন মোতাবিক খরচ করতেন।  আধুনিক আলিমদের মত আধুনিকতা পছন্দ করতেন না।  এসব ব্যাপারে কঠোর ছিলেন। বিভিন্ন প্রকার অনুষ্টান   করে টাকা অপচয় করা থেকে সর্বদা বিরত থাকতেন।  রিয়া মুক্ত আমল করতেন।  লোক দেখানো কথা এবং কাজ থেকে বিরত থাকতেন।যারা এসব করার জন্য হুজুরের কাছে অনুমতি চাওয়ার জন্য আসতেন তাদেরকে ধমক দিয়ে বের করে দিতেন।  শিরনি খাওয়া থেকে যথাসম্ভব হেফাজত থাকতেন।  ইন্তেকালের দুই দিন আগে পাশের গ্রাম থেকে হুজুরকে শিরনিতে নেওয়ার জন্য গাড়ী পাঠিয়েছিলো, কিন্তু হুজুর সাফ না করে দিয়েছেন তিনি  যাবেন না। আমি হুজুরের রুমে ছিলাম হুজুর বললেন এই শিরনি খাওয়া ঠিক নি? আমি বলছি জ্বি না। বললেন এটা জানো তো?  আমি বলছি হে জানি। 
উপস্থিত আরেকজন হুজুর ছিলেন তিনি বললেন : মৃত্য ব্যক্তির শিরনি খেলে অন্তর মরে যায়।  
কিন্তু আমরা এগুলো থেকে কি বেঁচে আছি?  নাহ বেঁচে নাই।।
:
পর্ব-১৩
মাদ্রাসার আসাতিযায়ে কেরামগণের জন্য হুজুরের মহব্বত ছিলো বর্ণাতিত।  নিজের বেতন বাকি রেখে উস্তাদগণের বেতন ভাতা আদায় করতেন।  বলতেন আমি পরে বেতন নিব,আগে আমার বিদেশী উস্তাদগণকে বেতন দিন।  হুজুরের ইন্তেকালের পর জানতে পারলাম প্রায় দশ মাসের টাকা হুজুর মাদ্রাসায় এখনো পান।  মাদ্রাসার উস্তাদগণের মধ্যে শায়খুল হাদীছ আল্লামা আব্দুল হাই বংশিপ্পা হুজুরকে খুব মূল্যয়ান করতেন, মহব্বত করতেন শ্রদ্ধা করতেন।  শায়খুল হাদীছ সাহেব ব্যতিত মাদ্রাসার সবাই বয়সে হুজুরের ছোট এবং হুজুর মাদ্রাসার সবচেয়ে প্রবীণ উস্তাদ ছিলেন।  মাদ্রাসার অধিকাংশ  উস্তাদ হুজুরের ছাত্র এবং অনেকেই আছেন ছাত্রের ছাত্র।  সবদিকে হুজুর সবার সিনিয়র ছিলেন বলেই সবাই হুজুরকে আলাদা ভয় করতেন এবং অনেক শ্রদ্ধা করতেন।  অনেক উস্তাদ মাঝে মাঝে হুজুরের খেদমত করতেন,যারা আগে হুজুরের ছাত্র ছিলেন।  গরমের দিন কারেন্ট না থাকলে কোন কোন হুজুর আছেন হুজুরকে পাখা দিয়ে বাতাস দিতেন। বিশেষ করে হুজুরের প্রিয় শাগরিদে রশিদ বর্তমানে মাদ্রাসারসিনিয়র মুহাদ্দিস এবং তিন মাদ্রাসার শায়খুল হাদীছ ও সৈয়দপুর দরগাহ জামে মসজিদের সম্মানিত ইমামও খতিব বিশিষ্ট ওয়ায়েজ মাওঃ সৈয়দ আব্দুর রাজ্জাক হা.হু.  হুজুরকে পাখা দিয়ে বাতাস দিতেন এবং দেখেছি হুজুরের পায়েও তেল মালিশ করে দিতে। হুজুর যা বলতেন সংগে সংগে পালন করার চেষ্টা করতেন।  হুজুর মাদ্রাসার প্রবীণ উস্তাদগণের প্রশংসা সর্বদা করতেন।  শায়খুল হাদীছ আল্লামা আব্দুর রউফ জকিগঞ্জী হুজুরের প্রশংসা করতেন।  বলতেন আমার মাদ্রাসার  এই উস্তাদের তুলনা অন্য কোন আলিমের সাথে হয়না,সত্যি জকিগঞ্জী হুজুরের মত আরো একজন উস্তাদ সমস্ত সিলেটেও পাওয়া যাবে বলে বিশ্বাস হয়না। হুজুরের অত্যন্ত কাছের মানুষ ছিলেন হুজুরের জামাতা উস্তাদে মুহতারাম হযরত মাওঃ সৈয়দ মাসরুর আহমদ কাসেমী সাহেবা বা.হা. যিনি হুজুরের পাশে থাকতেন, হুজুরের যে কোন কাজে কাসেমী সাহেবকে তলব করেন। হুজুরের ইন্তেকালের পর হযরত কাসেমী সাহেব হুজুর  অধিক শোকে কাতর হয়ে পড়েন। 
এরকম আরো........
:
পর্ব-১৪
গত ঈদুল আযহার দু'য়েকদিন পর আমি হুজুরকে কল করলাম।  সালামের পর আমি হুজুরকে বললাম হুজুর কেমন আছেন? 
হুজুর বললেন আমি অসুস্থ। 
আমি বললাম কি হয়েছে হুজুর? 
হুজুর বললেন সর্দি, জ্বর ।  
আমি বললাম হুজুর আমি এখন আসি। 
বললেন মাগরিব পর আসিও। 
মাগরিবের নামাজের পর আমি কিছু হাদিয়া নিয়ে হুজুরের দরবারে হাজির হলাম, হুজুর বাড়ির দ্বিতীয় তালায় থাকতেন।  আমি হুজুরের রুমে প্রবেশ করে দেখতে পেলাম খবরের আওয়াজ শুনা যাচ্ছে,রুমে লাইট অফ ছিলো।  হুজুর আমাকে বললেন খাটে হুজুরের পাশে বসতে।  আমি বসলাম ঠিক কিন্তু খবরের এই আওয়াজটা কোথায় থেকে আসছে ঠিক বুঝতে পারছিলাম না রুমের ভিতর থেকেই কোথায় থেকে যেন আসছে অনুভব করতে পারতেছিজা।  মনে মনে ভাবলাম হুজুরের ঘরের অন্য কোন রুম থেকে হয়তো আওয়াজ আসছে, কিন্তু নাহ!  হঠাৎ দেখলাম হুজুরের কাছেই এক কোণে একটি রেডিওতে সন্ধ্যার খবর বলছে এবং তা খুব মনযোগ সহকারে শুনছেন।মুলত  হুজুর এই রেডিও থেকেই দেশের খবরা খবর রাখতেন।  হুজুরের আধুনিক কোন মুবাইল ছিলোনা,আধুনিক মুবাইলকে হুজুর ঘৃণা করতেন।  বলতেন এই মুবাইল থেকেই আজ অনেক ছেলে মেয়েরা নষ্ট হচ্ছে। হুজুর মুবাইলে কথা বলার কারণে একটি বাস্তব ঘটনা ঘটেছিলো সেই বাস্তব ঘটনাটি আমাকে শুনালেন । আমি এই ঘটনাটি  শুনে খুব বেশি একটা অবাক হলাম না! কারণ আমি এসব কাহিনি সম্বন্ধে খুব অবগত।  হুজুরের সাথে আলাপ চলছে!  এমতাবস্থায় মাদ্রাসার বডিং সুপার সাহেব মাস্টার সাইফুল ইসলাম গাজী সাহেব হুজুরকে কল দিলেন। এবং উভয়ের  অনেক বিষয় নিয়ে আলাপ করলেন।  আর স্যারকে  বললেন এই বছর চামড়া খুব সস্তায় বিক্রি হয়েছে,খরচ পাতির পর মাদ্রাসার আশাতিত লাভ হয়নি। আগামি বছর থেকে আর কারো গরুর চামড়ার অর্ধেক আনবেন না,যদি দেয় তাহলে সারাটা যেন দেয়, আর যদি আনেন তাহলে সারাটা যেন আনেন। আজ হুজুর নাই জানিনা হুজুরের এই আশা পূরণ হবে কি না।  ফোন রাখার পর হুজুর আমাকে বললেন, দেখ মাস্টার সাহেব কত কষ্ট করেন,অন্য কেউ কি উনার মত কষ্ট করবেন? মাদ্রাসার চামড়া মহল্লায় মহল্লায় গিয়ে নিজে ট্রাক বুজাই  দিয়ে নিয়ে এনেছেন,এবং মাদ্রাসার ধান যখন বিক্রি হয়,তখন স্যার নিজে ধান পাল্লায় উঠিয়ে দেন অতঃপর আরেকজন  মেপে নিয়ে যান।  হুজুর বললেন  এই স্যারকে মহব্বত করবো নাতো কাকে মহব্বত করব?  মুহতামিম সাহেব স্যারকে অনেকদিন বডিংয়ের দায়িত্বে নিযুক্ত রেখে মূল্যায়ন করেছেন।
হুজুরের ইন্তেকালের পর স্যার জারজার করে কেঁদেছেন, নেত্রজলে বালিশ ভিজিয়েছেন।
মুহতামিম সাহেবের মত কে আর এরকম মহব্বত স্যারকে করবেন।
:
পর্ব-১৫
অত্যন্ত দক্ষতা এবং মাওলার প্রতি  পূর্ণ তাওয়াক্কুল রেখে সুদীর্ঘ আটাশ বছর এত বড় জামেয়া সুচারুরূপে পরিচালনা করে গেছেন।  মাদ্রাসার জন্য মাওলার দরবার ছাড়া মাওলার কোন গোলামের কাছে হাত পাতানো মোটেই পছন্দ করতেন না। মাদ্রাসার কোন প্রয়োজন আসতো তখন আল্লাহর সাহায্যের অপেক্ষা করতেন।  বলতেন আমার আল্লাহ সকল ব্যবস্থা করে দিবেন।  অনেকদিন অনেক উস্তাদ হুজুরকে মাদ্রাসার জন্য চাঁদা করতে বলেছেন কিন্তু হুজুর তা কানে নিতেনা না।  বলতেন আল্লাহই চালাইবেন।  আমাদের গ্রামের দুই হাজারের উপরে লোকসংখ্যা লন্ডনে প্রবাসী আছেন।  লন্ডনের অনেকেই বলেছেন হুজুর আপনে লন্ডনে আসেন,আমাদের গ্রামের অনেকেই লন্ডনে থাকেন, আপনে মাদ্রাসার জন্য চাঁদা করবেন, আপনে শুধু বলবেন আমরা বাকি কাজ যতটুকু লাগে করবো,কিন্তু হুজুর এতেও কান দিলেন না।  বলা বাহুল্য : গ্রামের যারা দেশে বিদেশে  প্রবাসী আছেন তাদের অন্তরে মাদ্রাসার মহব্বত থাকায় নিজ থেকে অথবা কোন চিঠিপত্রের মাধ্যমে আবদার করায় মাদ্রাসার সকল হাজত মাওলার আদেশে দীর্ঘ  সিয়াত্তর বছর যাবত পূরণ করে আসছেন। আল্লাহপাক সবাইকে জাযায়ে খায়ের দান করুন। আলহামদুলিল্লাহ এত বছর যাবত মাদ্রাসা সুচারুরূপে পরিচালনা করতে কোন কুপন চাঁদা উঠানোর জন্য বানানো হয়নি।  তবে যখন মাদ্রাসার টাকা ফুরিয়ে যেত তখন খুব চিন্তা করতেন। বডিংয়ের খরচাপাতির জন্য যখন ফান্ডে টাকা থাকতো না,তখন হুজুর নিজের পকেটে টাকা দিয়ে বডিং চালাতেন যদিও পরে নিজের টাকা নিয়ে নিতেন কিন্তু উপস্থিত সময়ে হুজুরের পকেটের টাকা ব্যবহার হতো।
আমি যখন ২০০২ ইং.সালে প্রথম মাদ্রাসায়  ভর্তি হই,তখন মাদ্রাসায়  দু'তালা  বিশিষ্ট তিনটি বিল্ডিং ছিলো,এবং মসজিদও শুধু এক তলা বিশিষ্ট ছিলো। মাদ্রাসার সামনে কোন দেয়াল ছিলোনা। দাওরায়ে হাদীছ ছিলো  দক্ষিণের বিল্ডিংয়ের নিচ তলার পূর্ব কোণার শেষের রুমে।  আর আমাদের জামাত মক্তব আওয়াল ছিলো প্রথমে বর্তমান হিফজ খানায়। তারপর আমাদেরকে দেওয়া হলো   বর্তমান দাওরায়ে হাদীছের ছাত্রাবাসে,এবং হিফজ জামাতকে তাদের এখনকার স্থানে ।  অতঃপর যখন পশ্চিমের ৩নং তলা পরিক্ষার হল রুম এবং ছাত্রাবাসের জন্য তৈরি করা হলো,তখন মক্তব আওয়ালকে ৩নং তলায় দিয়ে দাওরায়ে হাদীছকে মক্তব আওয়ালের রুমে নিয়ে আসলেন। অতঃপর উত্তর দক্ষিণে যখন তৃতীয় তলা তৈরি করলেন, তখন মাদ্রাসার মোটামুটি ছাত্রদের একটা আরামের আবাস্থল হলো,এখনো মাদ্রাসা এই অবস্থাতেই আছে। হুজুরের অন্তরের অভিপ্রায় ছিলো মাদ্রাসার সামনে সুন্দর একটি ফটক হবে,যে ফটকে মাদ্রাসাকে লোকচক্ষুতে রঙ্গিন করে দেখাবে,যে প্রধান ফটকটির দিকে লোকেরা একবার হলেও দৃষ্টিগোচর করবে,আপন প্রাণ জোড়াবে, মুগ্ধ হবে,বিস্মিত হবে,আফসোস করবে,যেই ফটকেই হবে মাদ্রাসার প্রধান। আলহামদুলিল্লাহ হুজুরের হৃদয়ের স্পৃহা মহান খালিক কবুল করেছেন। মাদ্রাসায় প্রবেশ করার প্রারম্ভে গেইটে নজর পরার পরেই হুজুরের অবধান কষ্ট ক্লেশের কথা মনে পড়ে যায়।মাদ্রাসার দক্ষিণ বিল্ডিংয়ের পূর্ব  কোণে এক রুমের জায়গা খালি ছিলো শেষ  জীবনে সেটুকুও পূর্ণ করলেন। এবং নিচ তলায় মাদ্রাসারক্যাশিয়ার সাহেব মাওঃ সৈয়দ মাসরুর কাশেমির জন্য একটি রুম এবং উপরে দাওরায়ে হাদীছ ও তৃতীয় তলায় কম্পিউটার রুম বানিয়ে মাদ্রাসার ইমারতের কাজ পূর্ণ করে গেলেন।  মসজিদে দু'তলা করে কী সুন্দর ডিজাইনে গ্লাস, টাইলস লাগিয়ে বিশাল উঁচু মিনার তৈরি করে সবার দৃষ্টি মসজিদের দিকে করে রেখে গেছেন। আল ফালাহ আছে শুধু হুজুর নাই।
বডিংয়ের জন্য কী ফিকির ছিলো হুজুরের নিকটাত্মীয়'রাই ভালো ভাবে বর্ণনা করতে পারবেন।  
একদিন আমি ক্লাস থেকে সোজা সামনের উপরের তৃতীয় তলার ছাদের উপরের দিকে নজর দিলাম, আশ্চর্য দেখি হুজুর তুফানে উঠিয়ে ফেলা টিনকে হাতে নিয়ে একটু এদিক সেদিক করছেন সম্ভবত মিস্ত্রি নিয়ে উঠে ছিলেন আমার ঠিক স্বরণ নাই। তখন আমি ভাবনার সাগরে হাবুডুবু খেতে শুরু করলাম,বৃদ্ধ বয়সে আজ হুজুর মাদ্রাসার জন্য কী কষ্ট করছেন কিন্তু সত্যিকার অর্থে হুজুরের কোন কিছুর অভাব নাই,চাহিলে বাড়িতে বসে বসে খেতে পারতেন এই ওসায়াত আল্লাহপাক হুজুরকে দিয়েছেন।  কিন্তু তবুও কেন বসে বসে দিন কাটাচ্ছেন না, এই বৃদ্ধ বয়সেও মাদ্রাসার খেদমত করছেন নিশ্চয় মাদ্রাসার মহব্বতে এবং মাওলাকে পাওয়ার জন্যে। জুহুরের নামাজের পর এখন আর হুজুর আমাদেরকে নসিহত করেন না,আমাদের জীবন পরিচালনা দিক নির্দেশনা দেন না,আমাদেরকে শাসন করেন না,আমাদেরকে নিয়ে দুয়া করেন না। হায় সব কিছু ঠিকঠাক আছে কিন্তু প্রাণের হুজুর নাই। 
আজ হুজুর নাই কিন্তু মাদ্রাসার প্রতিটা বালি কোণায়  হুজুর মিশে আছেন হুজুরের স্মৃতি এবং ভালবাসা মিশে আছে।
:
পর্ব-১৬
আমল ছিলো অনেক। তবে লোক সম্মুখে আমল করতেন খুব অল্প।  রিয়া মুক্ত আমল করতেন।  লোক দেখানো কোন কিছু কস্মিনকালেও পছন্দ করতেন না। যারা লোক দেখানো কোন কিছু করার অনুমতি নিতে আসতেন তাদের ধমক দিয়ে যথার্থ উত্তর দিয়ে বিদায় দিতেন।  অনুমতি দিতেন না।  যে আলিমরা বিনা প্রয়োজনে ছবি উঠাইতে অভ্যস্ত তাদেরকে উলামায়ে ছু বলে সম্বোধন করতেন।  পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথে হর হামেসা পড়তেন।  যখন নামাজ পড়তেন তখন দূর থেকে হুজুরের নামাজ আঁচ করতাম, এত বিনয়ের সাথে খোদাকে রুকু সেজদা করতেন দেখতে মনটা ভরে যেত।আল্লাহই জানেন হুজুরের নামাজে না জানি কত খুশউ খুযউ ছিলো।  ছাত্রদেরকে সব সময় আমল আখলাক্ব পরিশুদ্ধ করার তাগিদ দিতেন।  আমাকে বলতেন বাবা যাও কিছু আল্লাহ বিল্লাহ করো,ছাত্র জীবনে আল্লাহ বিল্লাহর খুব প্রয়োজন। আমি ইমামতি করি বলে, হুজুর আমাকে খুব বেশি মহব্বত করতেন।  
একদিনের ঘটনা : জুহুরের নামাজে হুজুর যাচ্ছেন আমিও হুজুরের পিছুপিছু চলছি হুজুর যখন মসজিদে প্রবেশ করলেন তখন উঁচু আওয়াজে বলছেন : بسم الله والصلاة و السلام على رسول الله.اللهم افتح لى ابواب رحمتك، আমি লক্ষ্য করছি হুজুর কি বলতেছেন।  
সাথে সাথে হুজুর আমাকে বললেন এই বল আমি কি বলেছি। আমি বললাম : بسم الله والصلاة والسلام على رسول الله .اللهم افتح لى ابواب رحمتك،তখন হুজুর আমাকে বললেই যে ব্যক্তি উভয় দুয়া পড়ে মসজিদে প্রবেশ করবে আল্লাহপাক তাকে মসজিদে প্রবেশের পূর্ণ সওয়াব দান করবেন।সুবহানআল্লাহ।।
আরো অনেক আমল হুজুরের আমার অল্প ব্যক্ত  করা সম্ভব না।।
:
পর্ব-১৭
সেদিন ছিলো ৬ ডিসেম্বর।  আমাদের জন্য বেদনার একটি দিন। সন্তানদের জন্য পিতার ছায়া মাথা থেকে সরে যাওয়ার দিন। মাদ্রাসায় ৩য় ঘন্টা চলছে। আমাদের জামাতে হবিবপুরী হুজুর দা.বা. শরহে জামি পড়াচ্ছেন। এমতাবস্থায় হঠাৎ আমরা চেয়ে দেখি বর্তমান মুহতামিম সাহেব হুজুরসহ কয়েকজন হুজুর মসজিদের দিকে দৌড়ে যাচ্ছেন। কিন্তু কি হয়েছে পরিষ্কারভাবে কিছু বুঝা যাচ্ছেনা। একজনকে ডাক দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম কি হয়েছে সে বলল মুহতামিম সাহেব হুজুর প্রেশার লো হওয়ায় পড়ে গিয়েছিলেন মাথায় কিছু আঘাত পেয়েছেন।  এদিকে সকল জামাতের ছাত্ররা বের হয়ে গিয়েছিল, হুজুররা সবাইকে জামাতে ডুকালেন।  এবং বললেন কিছু হয়নি হুজুরের প্রেশার লো হয়েছে, সেবা করা হচ্ছে ইনশাআল্লাহ কমে যাবে।  আমি আবার জামাত থেকে বের হলাম তখন দেখতে পেলাম মুফতি সৈয়দ শামিম আহমদ আর মাদ্রাসার মুয়াজ্জিন হাফিজ সাইদ ভাই,উভয়ের কাঁধে ভর করে মুহতামিম সাহেব হুজুরকে নিয়ে নিজ রুমে নিয়ে আসা হচ্ছে। হুজুরের রুমের ভিতর এবং সামনে ছাত্র উস্তাদগণ বেষ্টন করে আছেন।  আমি সাথে সাথে হুজুরের রুমের সামনে গেলাম গিয়ে দেখতে পেলাম, হযরত মাও: সৈয়দ আব্দুর রাজ্জাক হুজুর,এবং মুফতি মাহমুদ সাহেব হুজুর, এবং মুফতি শামিম সাহেব হুজুর ও মাওলানা দিলোয়ার সাহেব হুজুর,এবং মুয়াজ্জিন সাইদ ভাই হুজুরের খেদমত করতেছেন। কেউ পায়ে তেল মালিশ করছেন,কেউ হাতে তেল মালিশ করছেন,কেউ পাখা দিয়ে বাতাস দিচ্ছেন কেউ পিঠ মালিশ করছেন একেকজন একেক খেদমত করছেন।  আর বর্তমান মুহতামিম সাহেব হুজুর এবং ক্যাশিয়ার সাহেব হুজুরও উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা উভয় হুজুরের জন্য ডাক্তার আনা এবং হুজুরকে দ্রুত ডাক্তার নেওয়ার ফিকিরে ব্যস্ত ছিলেন।  তৎক্ষণাৎ আমি রুমে ডুকে হুজুরের খাটের পশ্চিম পার্শে উঠলাম এবং হুজুরের হাতে পায়ে তেল মালিশ করতে লাগলাম,তেল মালিশ করার কারন হলো হুজুরের হাত পা বরফের মত টান্ডা হয়ে গিয়েছিলো। 
হুজুরকে দুইবার নিজ হাতে ওর স্যালাইন খাওয়ালাইম।  আর এদিকে হুজুরকে অন্য উস্তাদগণ শুধু হুজুর আসেন ডাক্তারে  নিয়ে যাই।  হুজুর না ডাক্তারে যাবোনা!  দেখি আল্লাহ কী করেন আর শুনছিলাম মনে মনে কী যেন পড়তেছেন।  আমি শরীরের অবস্থা দেখি পুরা শংকায় পরে গেলাম হয়তো হুজুর আর বাঁচবেন না সবার মুখেই মরা মরা ভাব, অনেকেই তো কাদঁতে কাঁদতে চোখের পানি গাল বেয়ে পড়তেছে।  
শেষে একবার ওর স্যালাইনের পানি খেয়ে হুজুর বললেন এখন কিছুটা স্বস্তিবোধ মনে করছি। ইনশাআল্লাহ কমে যাবে দেখি আল্লাহ কী করেন ডাক্তারে যাওয়ার দরকার নাই।  হুজুর হয়তো বুঝে ফেলেছিলেন আজ হুজুরের শেষদিন তাই মহব্বতের মাদ্রাসায়ই জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে চেয়েছিলেন।  মাদ্রাসার জন্য এত মহব্বত ছিলো যে শুধু বলতেন আমার মাদ্রাসা, আমার মাদ্রাসা।  সুবহানআল্লাহ মাদ্রাসার জন্য এত মহব্বত আমি আর দেখিনি।  অবশ্যই অনেক আছেন যারা বিনা স্বার্থে মাদ্রাসার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছেন, করছেন।  আমি দেখতে পেলাম জনাব মুফতি শামিম সাহেব হুজুর কে আস্তে আস্তে কী যেন বলতেছেন সামান্য শুনতে পেলাম যে বলছেন হুজুর দুনিয়ায় চলতে গেলে এসবের প্রয়োজন হয়,তাই চলুন দয়া করে নিকটস্থ পেরুয়া হস্পিটালে শুধু পরিক্ষা নিরিক্ষা করে চলে আসবেন।  তৎক্ষণাৎ হুজুরের ছোট সাহেবজাদা মাওঃ সৈয়দ জিয়া উদ্দীন এসে পৌছে গেছেন, বললেন আব্বু চলেন গাড়ী নিয়ে এসেছি।  হায় হুজুরের জিয়া উদ্দীন ভাইয়ের জন্য  এত মহব্বত ছিলো, বাজারে খরচ পাতির জন্যে গেলে হুজুর উনার জিয়াউদ্দীন কে  সাথে নিতেন,আমার সাথে শুধু জিয়াউদ্দীন ভাইয়ের কথা আলোচনা করতেন। জিয়াউদ্দিন ভাইয়ের সুন্দর একটি ভবিষ্যতের চিন্তা করতেন।  কিন্তু হুজুর দুনিয়ায় থাকাবস্থায় উনার জিয়াউদ্দীনের কিছু দেখে যেতে পারেন, একবার একজনকে বলছিলেন তোমার মোটর সাইকেল আমার জিয়াউদ্দিনের কাছে বিক্রি করে ফেলো,যেহেতু তুমি নতুন একটি কিনতেছ। কিন্তু তাও পুরণ হলনা। তারপর কয়েকজন হুজুরকে ধরে উঠিয়ে গাড়িতে উঠালেন এবং পিছনের সীটে হুজুর এবং হুজুরের একপাশে হুজুরের জিয়া উদ্দিন এবং মাওঃ আখতার হুসাইন।
এবং সামনে শুধু হুজুরের জামাতা ক্যাশিয়ার মাওঃ সৈয়দ মাছরুর কাসেমী সাহেব।  সবাই হুজুরের বিদায় দিয়ে যার যার পথ ধরলো এবং আমিও আমার বাড়িতে দিকে রওয়ানা হলাম।
:



পর্ব-১৮
..........হুজুরের ইন্তেকাল..........
.
হুজুরকে বিদায় করার পর মাওঃ দিলওয়ার আহমদ ও মাওঃ আমিনুল ইসলাম রাজু সাহেব মহোদয় একটা সিএনজি দিয়ে হুজুরের পিছুপিছু রওয়ানা হলেন।  সে সময় আমি বুঝতেই পারি নি হযরতদ্বয় হুজুরের সাথে যাচ্ছেন। নয়তো আমি অবশ্যই লোকাল একা হলেও যেতাম।  যাই হোক আমার কপালে নাই হুজুরকে সিলেট পর্যন্ত বিদায় করার। তারা এসে বললেন প্রেশার লো তাছাড়া ডাইবেটিস ও বেড়ে গেছে সমস্যা আস্তে আস্তে বাড়ছে।  অবস্থা অবনতির দিকে দিকে।  সিলেট সাথে ছিলেন হুজুরের সাহেবজাদা জামাতা মাওঃ মাসরুর কাসেমী এবং নাতনির জামাই মাওঃ আখতার হুসাইন।  তারা হুজুরকে সিলেট মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে ভর্তি করে মাওঃ জিয়া উদ্দিন এবং হুজুরের মেয়ের জামাই মাদ্রাসার উস্তাদ হাফিজ আব্দুল হাদি কে রেখে আসেন।  এবং মাওঃ সানোয়ার আলি সাহেবও ছিলেন। তাদের কাছ থেকে সময়ে সময়ে বিভিন্নজন'রা খবর নিচ্ছিলেন এবং তারাও খবর দিচ্ছিলেন।  এদিকে ফেবুকের ওয়ালে শুধু হুজুরের অসুস্থতার খবর।  পড়ছিলাম আর কাদঁছিলাম সুস্থতার জন্য দুয়া চাচ্ছিলাম এবং করছিলাম। রাতে নয়টা হবে হঠাৎ ফেবুকে ডুকে দেখতে পাই এক ভাই স্ট্যাটাস দিছে হুজুর আইসিউতে আছেন।  আমি অবাক হয়ে গেলাম এবং অনেককে জিজ্ঞাসা করলাম কয়েকজন বলেছে সঠিক খবর। আমি তখন সত্যিই। খুবই পেরেশান হয়ে গেলাম লোকেরা এসব কি বলছে হুজুর কি সত্যিই আর আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন না। হায় আল্লাহ তুমি আমাদের হুজুরকে নেক হায়াত দান করো,কিন্তু সত্যি হুজুর আর ফিরে আসলেন না।
রাত ১২ টার কাছে সময়ে হা.সৈয়দ মনির আহমদ আমাকে ফোন দিলেন, বললেন তুই কোথায়? আমি বললাম ঘরে আছি চাচা কেন? উনি বললেন তাড়াতাড়ি আমাদের ঘরের সামনে এসো মুহতামিম হুজুরের অবস্থা অবনতির দিকে মাদ্রাসায় তাড়াতাড়ি যেতে হবে।  আমি তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বের হয়ে মনির চাচা'র সাথে খুব দ্রুতগতিতে মাদ্রাসায় গিয়ে উপস্থিত হলাম। এবং দেখতে পেলাম কয়েকজন উস্তাদবৃন্দ মাওঃ মাসরুর কাসেমী সাহেবের রুমে বসা।  সবাই হুজুরের জন্য আয়াতে কারিমা পাঠ করছেন,আর শায়খুল হাদীছ সাহেব মনে করছিলেন হয়তো কুরঅানের খতম হচ্ছে,তাই তিনি খুব আওয়াজে তেলাওয়াত করছিলেন,সুবহানআল্লাহ এত বৃদ্ধ বয়সেও এত সুন্দর আওয়াজে তেলাওয়াত শুনে সত্যিই মুগ্ধ হয়েছিলাম,প্রথমে যদিও ভেবেছিলাম হিফজের বড় কোন ছাত্র হয়তো তেলাওয়াত করছে! কিন্তু পরে বুঝতে পারলাম আমার ভাবা ভুল ছিলো। হুজুরকে আমি আর হা. মরগুব দুয়া করার জন্য ধরে আস্তে আস্তে নিয়ে আসলাম।  দাদা হুজুর দুয়া শুরু করতেই সবাই আবেগ আপ্লুত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।  অনেক সময় দুয়া হয়। মাওঃ মাসরুর আহমদ কাসেমী সাহেব আমাকে বলেন শফিক এখন তাহাজ্জুদের সময় দু'চার তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে হুজুরের জন্যে দুয়া করো। আমি বললাম ইনশাআল্লাহ হুজুরের জন্যে আমি রোজা রেখে দিব। তারপর আমি মনির চাচা মরগুব আমাদের হিফজের উস্তাদে মুহতারাম হা.গিয়াস উদ্দিন বা.হা.এর কামরায় যাই হুজুর আমাদেরকে বিস্কুটের পেকেট বের করে দিলেন এবং তাদের থেকে আমি বিস্কুট কয়েকটা বেশি খেলাম এবং এই বিস্কুটেই ছিলো আমার সেদিনের সেহরি খাওয়া। কিন্তু কেউ টেরই পায়নি আমি সেদিন রোজা ছিলাম। আস্তমা হুজুরের রুম থেকে যখন নিচে আসলাম কিছুক্ষণের মধ্যেই মাওঃ আখতার হুসাইন সাহেবের কাছে খবর আসলো হুজুর দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন।  ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন।
তখন কেউ কেউ নিরব নিস্তব্ধ কেউবা কান্নায় মাদ্রাসায় আকাশ বাতাস ভারী করে তুললো।
:
পর্ব ১৯ 
হুজুরের ইন্তেকালের খবর শুনে হুজুরের স্নেহর মাদ্রাসা মসজিদের মুয়াজ্জিন আবেগ আপ্লুত হয়ে খুব জোড়ে চিৎকার দিয়ে কাঁদতে থাকেন।  উনার কান্না শুনে ঘুমন্ত অনেক উস্তাদ ছাত্রের নিদ্রা ভেঙে যায়। আর অনেকেই যেন জ্ঞান হারিয়ে নিরব নিস্তব্ধ হয়ে গেছেন।  চতূর্দিকে হুজুরের ইন্তেকালের খবর জানানো হচ্ছে।  কাসেমী সাহেব হুজুর এবং আরো কয়েকজন সিদ্ধান্ত করলেন সিলেট থেকে হুজুরের লাশ এগিয়ে আনতে।  কিন্তু এত রাত গাড়ী কোথায় পাবো? গাড়ি পেলেও গাড়ির ড্রাইভার এত রাত ঘর থেকে বের হতে রাজি না।  তাই আমাকে এবং কাসেমী সাহেবের সাহেবজাদা আমরা দু'জনকে বলা হলো।  তোমরা দু'জন গাড়ির ড্রাইভারকে তার বাসা থেকে নিয়ে আসো। যাওয়ার পথে আমি হা.মারগুবকে বললাম আসো আমরা জকিগঞ্জী হুজুরকে খবরটা দিয়ে যাই (জকিগঞ্জী হুজুর আর মুহতামিম সাহেব হুজুরের মাদ্রাসার শিক্ষকতা এক বছর কম ৪৭/৪৮) ।  আমি যখন জকিগঞ্জী হুজুরের দরজায় আস্তে করে ধাক্কা দিলাম, সাথে সাথে দরজা খুলে যায় (হুজুর দরজার সিটকারি না লাগিয়ে প্রতিদিন ঘুমান) হুজুর দরজার আওয়াজ শুনে বললেন কে আমি বাতি জ্বালিয়ে বললাম হুজুর আমি শফিক। বললেন এত রাতে কি বেটা?  যখন বললাম : মুহতামিম সাহেব হুজুর ইন্তেকাল  করেছেন।  তখন হুজুর সাথে সাথে খুব আওয়াজে পরপর দু'বার ইন্নালিল্লাহ ইন্নালিল্লাহ বলে উঠলেন।  আমি মনে মনে ভয় পেয়েগেছিলাম হুজুরও মুরুব্বি এখন কি এই দুঃসংবাদ হুজুরকে দেওয়া ঠিক হয়েছে,আহ যদি হুজুরের কিছু হয়ে যেত। তাহলে তো আমি সারা জীবন অপরাধী হয়ে থাকতাম।  তারপর হুজুর জিজ্ঞাসা করলেন কখন ইন্তেকাল করেছেন। বললাম এইতো একটু আগে অতঃপর লাইট নিভিয়ে চলে আসলাম ড্রাইভারের বাসায়।  ড্রাইভার বাসা থেকে বের হয়ে গেরেজ থেকে গাড়ি নিয়ে রাদিস শপিং য়ের সামনে আসলো এবং যারা যারা যাবেন তারাও উঠলেন আমিও উঠলাম।  পথিমধ্যে হুজুরের প্রিয়ভাজন ছাত্র চৌধুরী বাড়ি পাঞ্জেগানা মসজিদের ইমাম ও খতিব মাওঃ সৈয়দ আবু আলী সাহেবকে নেওয়ার জন্য গাড়ি থামানো হলো। ইমাম কাদঁতে কাঁদতে গাড়ি উঠলেন সম্ভবত অনেক সময় থেকে কাঁদছেন।  শুনেছি ইমাম সাহেব হুজুর নাকি যখন মুহতামিম সাহেবের ইন্তেকালের খবর শুনেছেন তখন খুব কেঁদেছেন চিৎকার দিয়ে কেঁদেছেন তখন উনার সাহেবজাদারা উপরের তলা থেকে এসে বলল আব্বু আপনার কি হয়েছে আপনে কাঁদছেন কেন? উনি জবাব দিলেন আমার হুজুর মারা গেছেন। আহ! হুজুরের জন্য ছাত্র কি মহব্বত।  আমাদের গাড়ি সিলেটের দিকে চলছে.. গাড়ির ভিতরে হুজুরের অনেক স্মৃতি অনেক কথা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে আর হুজুরের শূন্যতায় আহাজারি আর অনুতাপ সবার চোখ জারজারিয়ে পানি পড়ছে.....
:
পর্ব ২০
গাড়ির গ্যাসের স্বল্পতা তাই গাড়িতে গ্যাস ভরতে হবে।  ড্রাইভার গ্যাস পাম্পে গাড়ি আটকিয়ে গ্যাস ভরছে।  আমার আর ইমাম সাহেবকে পেশাব খুব চাপছিলো তাই আমরা এই ফাকে পেশাব করতে গেলাম ।  আমরা যখন ইস্তেঞ্জা করছিলাম তখন হুজুরের লাশবাহী এম্বুলেন্স এসে গ্যাস পাম্পে থামলো তখন আমরা দু'জন ছাড়া সবাই দেখেছিলেন আমরা আসতে আসতে গাড়ি চলে গেল। আমরা মাহরুম রয়ে গেলাম। অতঃপর এসে জানতে পারলাম কাসেমী সাহেব হুজুর হুজুরের লাশের গাড়ির সাথে চলে গেছেন।  অতঃপর আমরা সিলেটে আর যাওয়া লাগেনি এখান থেকেই আমরা বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলাম।  লাশবাহী গাড়ির পিছনে পিছনে আমাদের গাড়িও চলছে।  বাড়িতে এসে যখন হুজুরের লাশ নামানো হলো তখন হায় কান্না মনের অজান্তে সবার চোখে পানি এসে গেল।  হায় কাকে আমরা হারালাম।
সকাল সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত বাড়িতে মানুষেরা লাশ দেখলো তারপর লাশ মাদ্রাসায়  নিয়ে আসেন।  মাদ্রাসায় বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা ছাত্র এবং ভক্তি বৃন্দরা লাইন ধরে দেখেছেন আর আমি আর হা.সৈয়দ নাহিদ আহমদ লোকজনকে লাশ দেখাচ্ছি। অনেকেই লাশের মুখ দেখে ব্যতিত হয়ে যান হায় তাদের বিষণ্ণ মন দেখে আমাদের চোখের পানিও অবিরাম মুছতেছি। হুজুর একজন শাগরিদ শায়খুল হাদীছ আল্লামা মোশাহিদ আহমদ শাদিপুরী হুজুর আমাদেরকে বলেন আমাকে একটু আমার হুজুরের কাছে দাও আমি হুজুরকে মন ভরে দেখি। তারপর পেকেট থেকে আতর বের করে হুজুরের নাকে মুখে লাগিয়ে দেন,অতঃপর আমিও আমার পকেট থেকে আতর বের করে হুজুরের নাকে মুখে লাগিয়ে দেই।
হাজার হাজার মানুষের সমাগমে কিছুক্ষণের জন্য মাটে লাশ দেখানো হলো। হায় একজন ছাত্র সম্ভবত শেষে এসেছে, এসেই খুব কান্নায় ভেঙে পড়েন।  জানাযার নামাজ পড়ান হুজুরের স্নেহের ছোট সাহেবজাদা মাও: সৈয়দ জিয়াউদ্দিন।  অতঃপর লাশ নিয়ে কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয় তারপর দাফন করে কবর জিয়ারত করে দুয়া করেন হুজুরের জামাতা মাদ্রাসার উস্তাদ হা.সৈয়দ আব্দুল হাদি সুমন।  
দাফন শেষে আমার এমন অবস্থা হয়েছিলো যে হাত পা দূর্বল হয়েছিলো কারণ রোজা রাখায় সারাদিন খানি হয়নি আর নিজের বাড়ি থেকে হুজুরের বাড়ি এবং মাদ্রাসায় আসা যাওয়া ঘুম কম হওয়ায় শরীরটা অচেতন হয়ে গিয়েছিলো।
:
পর্ব-২১
বিশ্বের মুসলমানদের খুব বেশি দরদ ছিলো।  খুব রাগের মধ্যে থাকলেও মুসলমানদের নির্যাতনের কথা শুনলে মন নরম হয়ে যেতব। হুজুরের ইন্তেকালের দু'দিন আগে হুজুর ছিলেন অগ্নিশর্মা রাগে চেহারা লাল বর্ণের হয়ে গিয়েছিলো।  বেত হাতে নিয়ে এদিকওদিক ঘুরছিলেন।  কেউ তাঁর ধার ভিরতে সাহস পাচ্ছিলেন না।  খুব রাগী আওয়াজে কথা বলছেন।  এমতাবস্থায় আমি একজনকে হুজুরের কাছে নিয়ে গেলাম (সে প্রায় দু'মাস বাড়িতে থাকায় মাদ্রাসার হাজিরা খাতা থেকে নাম কেটে দেন।  সে আমাকে বলছে আমি যেন তাকে নিয়ে যাই) ।  হুজুরের রুমের সামনে যেতেই হুজুরকে আমরা সালাম করলাম।  হুজুর বললেন তোমরা কিসের জন্যে এসেছো?  হুজুর জ্বি না মানে!!  আসো ভিতরে আসো কি হয়েছে?  তখন আমি হুজুরকে খুব রাগান্বিত দেখে বললাম হুজুর রোহিঙ্গাদের অবস্থা জানেন? তাদেরকে এমনভাবে নির্যাতন নিপিড়ন  এবং অত্যন্ত কটুরভাবে মুসলমানদের কে শহিদ করছে।  মুসলমান মেয়দেরকে জীবিত অবস্থায় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কেটে যা ইচ্ছে তা করছে। মুসলমান যুবকদেরকে জীবিত আগুনে পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে। শিশুদেরকে ইতিহাসের বর্বর নগন্য জঘন্য শাস্তি দিয়ে শহিদ করা হচ্ছে।  বৃদ্ধ পিতা মাতাকে অপমানিত করে তাদের সামনে তাদের সন্তানাদিদের ইজ্জত লুণ্টন সহ বিভিন্নভাবে কষ্ট দিচ্ছে। এগুলো শুনে হুজুরের মন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে অতঃপর এগুলো শুনে একেবারে কাঁদা কাঁদা ভাব হয়ে গেল এবং এ বিষয়ে অনেক কিছু আলাপ করে সেদিন প্রায় দু'ঘন্টা আমাদের সাথে কথা বলেন।  আর সেই কথোপকথনই ছিলো হুজুরের সাথে আমার জীবনের শেষ কথোপকথন।




লেখকঃ- হাফিজ শফিকুল ইসলাম শফিক     

0 Comments