বাংলাদেশের প্রথম শায়খুল হাদীছ



বাংলাদেশের প্রথম শায়খুল হাদীছ    


শায়েখ শারফুদ্দীন আবু তাওয়ামাহ রহ.

ঢাকার নিকটবর্তী ছোট্ট একটি গ্রাম।  নাম তার সোনারগাও।  সেখানে অনেক অনেক পুরাতন একটি কবর আছে। আমরা অনেকেই জানিনা এই পুরাতন কবরটি কার জন্য খনন করা হয়েছিলো। এবং কাকে এই কবরে দাফন করা হয়েছিলো। এবং কখন দাফন করা হয়েছিলো। তখন সন কত ছিলো। হ্যা এই কবরটি প্রায় সাতশত পূর্বে কিংবা তার চেয়ে অধিক আগে খনন করা হয়! এই কবরটিতে দাফন করা হয় সেই যুগের সবচেয়ে বড় আলিম ও সবচেয়ে বড় ফকিহকে। 
কিন্তু আমরা অনেকেই তার নাম এবং পরিচয় জানিনা। হ্যা আমি বলছি ঐ কবরটি খনন এবং কবরটিতে দাফন করা হয় শায়খ শারফুদ্দীন আবু তাওয়ামাহ রহ.কে। যিনি ছিলেন বাংলার সর্বপ্রথম মুহাদ্দিস এবং তিনি ছিলেন বাংলার প্রথম শায়খুল হাদীছ, এমনকি তিনি সর্বপ্রথম বাংলায় বুখারি ও মুসলিমের পাঠ দান করেন। এবং তিনিই বাংলায় সর্বপ্রথম ইসলামি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন।

দ্বীনের দাওয়াত পৃথিবীর সর্বত্র পৌছানো!
.
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইন্তেকালের পর।  নবীজীর সাহাবিরা পৃথিবীর সর্বত্রে, পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণে, ছড়িয়ে পড়েন।  এবং তারা নিজেদের দেশ ত্যাগ করেছেন, ত্যাগ করেছেন নিজেদের আহল আয়ালকে,এবং ছেড়ে এসেছেন আরবের ভূখণ্ডে অবস্থিত নিজেদের ঘরবাড়িকেও।  কিন্তু তারা নিজেদের দেশ,ঘরবাড়ি, বউ বাচ্চা ত্যাগ করেছেন কেন? অনেকেই মনে করবেন বাদশাহির জন্য কিন্তু না!  তাহলে ব্যবসার উদ্দেশ্যে?  তাও না! আশ্চর্য তাহলে কি জন্য?  দুনিয়াতে তো আমরা দেখতে পাই মানুষ ব্যবসা ইত্যাদির জন্য নিজের দেশ,ঘরবাড়ি ত্যাগ করেন কিন্তু তারা আসলে কি জন্য ত্যাগ করলেন? হ্যা তারা সব কিছু ত্যাগ করেছেন শুধু আল্লাহর কিতাব কুরআনকে পৃথিবীতে পৌছানোর জন্য। এবং রাসুলুল্লাহ সাঃ এর সুন্নতকে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। এবং মানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করার জন্য এবং মানুষকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে আনার জন্য। এবং দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে বের করে প্রশস্ততার দিকে নিয়ে আসার জন্য। বাংলায় দাওয়াতের জন্য অনেকেই আসেন। হিজাজ থেকে এসেছেন অনেকেই এবং অনেকেই এসেছেন ইয়ামন থেকে, এসেছেন অনেক সিরিয়া থেকে এবং অনেকেই এসেছেন ইরাক থেকে,  অনেকেই এসেছেন ইরান থেকে, অনেকেই আফগানিস্তান থেকে এসেছেন, অনেকেই তুর্কি থেকে এসেছেন অনেকেই বুখারা থেকে এসেছেন।  দুনিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে অনেকেই এসেছেন।। 
.
বুখারা থেকে হিন্দে কে এসেছিলেন?

বুখারা থেকে এসেছিলেন শায়খ শারফুদ্দীন আবু তাওয়ামাহ রহ. বুখারা হলো ইমাম বুখারি রহ. এর জন্মস্থান।  তিনি এসেছিলেন হিন্দে।  কিন্তু কেন তিনি নিজের দেশ ছেড়ে হিন্দে এসেছিলেন? কেন তিনি দাওলাতে ইমামে বুখারিকে ছেড়ে  হিন্দু রাষ্ট্রে  এসেছিলেন? জানেন?  হ্যা তিনি এসেছিলেন দাওয়াতের জন্য।  যাতে হিন্দুদেরকে আহবান করে ইসলামের দিকে আনতে পারেন। যাতে আহলে হিন্দকে বের করে আনতে পারেন হিন্দুত্ববাদের অন্যায় থেকে আদলে ইসলামের দিকে। তিনি তাদেরকে সুন্নতের অনুকরণে আহবান করেন, এবং শিরিক এবং বেদয়াত থেকে নিজেকে পরহেজ করার আহবান করেন। এবং যাতে তিনি তাদেরকে তাদের দ্বীনের ব্যাপারে শিক্ষা দিতে পারেন। 
.
হিন্দের মধ্যে। 
.
শায়খ শারফুদ্দীন আবু তাওয়ামাহ রহ. দিল্লিতে এসে পৌছলেন। দিল্লি তখনকার জমানায় হিন্দের রাজধানী ছিলো। সেই যোগে দিল্লি ছিলো একটি বড় শহর। সেই যুগে দিল্লিতে অনেক হায়িল লোক বসবাস করতো। অতএব যখন লোকেরা তার মহান চরিত্র দেখতে পেলো। এবং তার এখলাস ও তার বিনয়ীতা এবং তার ইবাদত এবং তার তুষ্টি দেখতে পেলো তখন সবাই তাকে খুব ভালোবাসতে শুরু করলো। এবং তার চতুর্পাশে লোকেরা জড়ো হতে লাগলো। এবং তারা তার আনুগত্যশীল হয়ে গেলো। অল্প সময়ের মধ্যে তার অবস্থা প্রচার হতে লাগলো। কিছু মানুষ তার প্রতি হিংসা করতে লাগে এবং তার প্রসিদ্ধতা ও তার স্থানের প্রতি হিংসা করতে থাকে। তারা তার অবস্থা হিন্দুস্থানের বাদশাহ গিয়াসউদ্দিন বালবানের কাছে উত্তাপন করে। অতএব বাদশাহ তার দেশ ও বাদশাহির  ব্যাপারে শায়খকে ভয় করতে থাকে। এবং বাদশাহ তাকে তলব করে দিল্লি থেকে বের করে দেন এবং তিনি বাংলাদেশের দিকে সফর করেন। 
.
বিহারে কিভাবে আসলেন? 
.
শায়খ শারফুদ্দীন রহ. দিল্লি থেকে বের হয়ে চলে আসেন। এবং বিহার এসে পৌছেন। অতএব  রাস্তায় আহমদ ইবনে ইয়াহইয়া মনিরির সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। তৎক্ষনাৎ আহমদ ইবনে ইয়াহইয়া মনিরি তার ছাত্র হয়ে যান। আহমদ ছিলেন অতি ছোট বাচ্চা। আহমদের বয়স ছিলো ইবতেয়াদীর ছাত্রদের বয়সের মতো। আহমদের বয়স ছিলো খেলাধুলার বয়স। কিন্তু সে তার খেলাধুলা, এবং তার মাতা ও তার দেশকে ত্যাগ করে তার উস্তাদ শায়খ শারফুদ্দীন আবু তাওয়ামাহ রহ. এর সাথে সফর করেন। তার মা থেকে অনেক দূরের স্থানে।  তার নিকটাত্মীয় ও আত্মীয়জসজন থেকে অনেক দূরে। আমরা কি জানি কি জন্য সে উস্তাদের সাথে সফর করেছিলো? নাহ জানিনা। হ্যা তিনি সফর করেছিলেন ইলিম,আমল,কুরআন ও হাদীছের জ্ঞানার্জন এর জন্য।  
.
আর ইলিম অর্জন হয়না চেষ্টা ও প্রচেষ্টা ব্যতিত।
ইলিম অর্জন হয়না ভ্রমন আর সফর ব্যতিত।
ইলিম অর্জন হয়না কষ্ট আর মুয়ালা ব্যতিত। 
.
এই গুণগুলো যেসব ছাত্রদের মধ্যে থাকবে আল্লাহ তায়ালা এই ছাত্রদের হুলমকে বাস্তবায়িত করবেন।
আর আল্লাহ তায়ালা তার মায়ের দোয়া কবুল করেছেন। তিনি তার উস্তাদের সান্নিধ্যে অনেক লম্বা সময় অতিবাহিত করেন। বিশ বছর সময় অতিবাহিত করেন৷  এবং তার থেকে গ্রহণ করেছেন অনেক উপকারী জ্ঞান। অবশেষে তিনি অনেক বড় আলিম হয়ে যান এবং পৃথিবীর সবার কাছে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। 
.
সোনারগাওয়ে তিনি কিভাবে আসলেন?
.
শায়খ শারফুদ্দীন আবু তাওয়ামাহ রহ. সোনারগাওয়ে এসে পৌছলেন। তিনি সেখানে এসে পান একটি সুন্দর শহর। এবং একটি বড় শহর। এবং একটি উন্নত শহর। 
এবং সেখানে তিনি পান অধিক বাসিন্দা ও অনেক ঘরবাড়ি এবং অনেক রাস্তা ও অসংখ্য বাজার। সেখানে পান অনেক গাছগাছালি ও নদীনালা এবং তিনি পান সেখানে অনেক ব্যবসাবাণিজ্য এমনকি সবকিছুই সেখানে তিনি পান। কিন্তু সেখানে তিনি কোন মাদ্রাসা পাননি! এবং পাননি কোন ইলমপিপাসুদেরকে। এবং পাননি একজন আলেমকেও। এভাবে তিনি কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনিস পাননি। 
.
মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা.. 
.
সোনারগাওয়ে তিনি বড় একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এবং সেখানে বসে তিনি কুরআন শিক্ষা দিতেন। এবং তিনি সেখানে বসে হাদীছের দরস দিতেন। এবং তিনি সেখানে বুখারি,মুসলিম,ফিক্বাহ,রিয়াযিয়্যাত,কিমিয়াহ, জুগফারিয়্যাহ, এবং ইলমে ত্বীব। এবং ছাত্রদের সংখ্যা দিনদিন বাড়তে থাকে। এহাতেক কে ছাত্র সংখ্যা  হাজারে গিয়ে পৌছে। মাদ্রাসার মধ্যে হাজারো ছাত্র এবং অনেক উস্তাদবৃন্দ ছিলেন। এটা ছিলো বাংলার প্রথম একটি বড় মাদ্রাসা। প্রথম এই মাদ্রাসায় হাদীছ শরীফের দরস দেওয়া হতো। এবং বাংলার প্রথম মুহাদ্দীছ ছিলেন শায়খ শারফুদ্দীন আবু তাওয়ামাহ রহ.  
শায়খ শারফুদ্দীন আবু তাওয়ামাহ রহ. এর ইন্তেকাল
শায়খ এই মাদ্রাসার ছাত্রদেরকে প্রায় ২০ বছর যাবত দরস দেন।
এবং বিশ বছরযাবত মাদ্রাসা পরিচালনা করেন। অতঃপর তিনি ইন্তেকাল করেন। এবং মাওলায়ে হাকিকির দরবারে মিলিত হোন। এবং সোনারগাওয়ের মাটিতে তার মৃত দেহ দাফন করা হয়। ঐ পুরতন কবরটিতে তিনি প্রায় সাতশত বছরযাবত শুয়ে আছেন। 
.
মাদ্রাসায়ে শারফ..
.
হ্যা শায়খ শারফুদ্দীন আবু তাওয়ামাহ রহ. মৃত্যুবরণ করেন। এবং তাকে কবরের মধ্যে দাফন করা হয়। কিন্তু কোথায় তার বড় মাদ্রাসাটি? এবং কোথায় গেলো সেই মাদ্রাসাটি? এবং কোথায় গেলো মাদ্রাসার গুরুত্বপূর্ণ মাকতাবাহ। এবং কোথায় গেলো সেই মাদ্রাসার হাজারহাজার ছাত্র সংখ্যা? বিষন পরিতাপ নিয়ে আমি তোমাদেরকে বলছি। মাদ্রাসার স্থায়িত্ব প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুর পরবর্তী কিছুদিন বাকি ছিলো। আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেনা কত সময় স্থায়িত্ব ছিলো। অবশেষে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। দুঃখের বিষয় হলো মাদ্রাসাটিও শেষ হয়ে যায়! ইতিহাসের কবরে দাফন হয়ে যায়! মাদ্রাসার ছাত্রবৃন্দ ও উস্তাদরা হারিয়ে যান! এবং সেই মাদ্রাসাটির পুরাতন কিছু ভিত্তি অবশিষ্ট থাকে। এবং কামরাগুলোর কিছু অবস্থা ও তার সবিশেষ চিহ্ন। অবশেষে আল্লাহ তায়ালা কোন একদিনের সন্নিকটে প্রেরণ করলেন শায়খ আবুল হাসান আলী নদবীকে। 
অতএব শায়খ হিন্দ থেকে সোনারগাওয়ে আসলেন। 
এবং তিনি সেই পুরাতন মাদ্রাসাটি পুনঃসংস্কার করেন। এবং নাম রাখেন, মাদ্রাসাতুশ শারফ। 
শায়খ শারফুদ্দীন আবু তাওয়ামাহ রহ. এর স্মরণে। তার ইতিহাস ও তার জীবনের স্মরণে। বাংলার জমিনের মধ্যে তার কাজগুলোকে স্মরণ রাখার জন্য। এইভাবেই উপকারী ইলমের ফলসমূহ ও নেক আমলকে স্মরণ রাখা হয়।
তার মাওতের পরেও তার জন্য আমল ও সওয়াব জারি রাখা হয়।



অনুবাদক -  হাফিজ ক্বারী শফীকুল ইসলাম
শিক্ষার্থী- জামেয়া সৈয়দপুর    



0 Comments