আদর্শ শিক্ষকের গুণাবলী



আদর্শ শিক্ষকের গুণাবলী -  শিব্বির আহমদ উসমানী 


শিক্ষার আলো মানুষের মনকে আলোকিত করে এবং মানবিক গুণাবলিকে করে বিকশিত। আমরা ছোটবেলায় রূপকথার গল্পের মতো একজন আদর্শ শিক্ষকের রচনা বা প্যারাগ্রাফ পড়তাম। একজন আদর্শ শিক্ষকের আসলে কী কী বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার। কিংবা কোন কোন গুণাবলী তাকে গড়ে তুলবে একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে।
অনেকেই মহান শিক্ষকতা পেশার সাথে জড়িত তবে সবাই আদর্শ শিক্ষক হতে পারেন না। একজন আদর্শ শিক্ষকই জাতির মেধা গড়ার কারিগর। তাই তাঁকে হতে হবে সেরা মানুষ, অন্য আট/দশজন মানুষের ছেয়ে ব্যতিক্রম। কেননা তাকে দেখেই শিখবে আগামী প্রজন্ম। একজন আদর্শ শিক্ষকের অনেক গুনাবলীর মধ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি গুণাবলী বা বৈশিষ্ট্য আলোচনা করি।

১. সবসময় প্রস্তুত থাকেন:
একজন আদর্শ শিক্ষক নিজেকে সবসময় প্রস্তুত রাখেন। ছাত্রছাত্রীদের সকল সমস্যার সমাধানে যেন তিনি ত্রাণকর্তা হিসেবে এগিয়ে আসতে পারেন সে বিষয়ে সতর্ক থাকেন এবং তাদের সার্বিক প্রয়োজনে নিজেকে বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত থাকেন।

২. জ্ঞানপিপাসু:
আদর্শ শিক্ষক হতে হলে সবসময় জ্ঞানপিপাসু থাকতে হয়। পড়াশোনা ছাড়া একজন আদর্শ শিক্ষকের জীবনে আর কিছুই করার থাকে না। নিজেকে সবসময় ব্যস্ত রাখেন পড়াশোনা মাঝে। তার আরও অনেক বেশি জানার পিপাসা থাকে যেন তিনি তার জ্ঞানটুকু ছাত্রদের মাঝে বিলিয়ে দিতে পারেন। তারা পড়তে অনেক বেশি ভালোবাসেন।

৩. প্রত্যেকের সক্ষমতা বিবেচনা করে থাকেন:
একজন আদর্শ শিক্ষক সকল শিক্ষার্থীর শেখার সমান সুযোগ সৃষ্টি করে থাকেন। শিক্ষকতার প্রধান কাজ শিখন-শেখানো কার্যাবলী পরিচালনা করা। তাই শিক্ষক বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়বদ্ধ থাকেন। শিক্ষার্থীদের প্রত্যেককে ভালোভাবে জানার চেষ্টা করেন, তাদের স্বকীয়তাকে শ্রদ্ধা করেন এবং তাদের প্রত্যেকের পৃথক পৃথক সক্ষমতাকে বিবেচনা করে থাকেন।

৪. কথা ও কাজের মিল থাকে:
একজন আদর্শ শিক্ষকের কথা ও কাজে মিল থাকে। তিনি কখনও ছাত্রছাত্রীদের মিথ্যা আশ্বাস দিবেন না। শিক্ষার্থীদেরকেও কথা ও কাজে মিল রাখার ব্যাপারে দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকেন।

৫. সব পরিবেশের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেন:
এমন অনেক মানুষ আছে যারা যেকোনো পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন না। ফলে অনেক ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হন। কিন্তু একজন আদর্শ শিক্ষক নিজেকে এমনভাবে প্রস্তুত করে ফেলেন যেন যেকোনো ধরনের পরিস্থিতিতে নিজেকে খুব সহজে মানিয়ে নিতে পারেন এবং যেকোনো ধরনের পরিবর্তনে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেন।

৬. ছাত্রছাত্রীদের সত্যের পথে চালিত করেন:
একজন আদর্শ শিক্ষক তাঁর ছাত্রছাত্রীদের সবসময় সত্যের পথে চালিত করে থাকেন। কেননা তার কাছে অন্যায়ের কোনো আশ্রয় নেই। তিনি ছেলেমেয়েদের সবসময় ন্যায়ের সাথে চলতে পরামর্শ দেন এবং সত্যের আদর্শে নিজেদের গড়ে তুলতে নির্দেশ দেন।

৭. ছাত্রছাত্রীদের উৎসাহ দিয়ে থাকেন:
একজন আদর্শ শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের একটি নির্দিষ্ট উপায়ে পড়িয়ে থাকেন এবং সবসময় উৎসাহ দিয়ে থাকেন। তিনি ভালো করে জানেন যে উৎসাহ ছাড়া একজন শিক্ষার্থী ভালোভাবে এগোতে পারে না। এ কারণে ছাত্রছাত্রীদের কল্যাণে তিনি তাদের উৎসাহ দিয়ে থাকেন সঠিকভাবে এগিয়ে যেতে।
সকল ছাত্রছাত্রীদের জন্য নিরাপদ ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পেশাগত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে থাকেন।

৮. ছাত্রছাত্রীদের সাথে আত্মিক বন্ধন তৈরি করেন:
একজন আদর্শ শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের সাথে এক ধরনের আত্মিক বন্ধন তৈরি করে ফেলেন। যার ফলে ছাত্রছাত্রীরা যেকোনো সমস্যায় শিক্ষকের কাছে চলে যান এবং তিনি তা খুব সহজ উপায়ে সমাধান করে দেন।

৯. আনন্দের সাথে পড়িয়ে থাকেন:
একজন আদর্শ শিক্ষক ভালোভাবেই জানেন কোন উপায়ে ছাত্রছাত্রীদের পড়ালে তারা বিষয়টিকে খুব সহজই গ্রহণ করতে পারবে এবং কোনো ধরনের বিরক্ত লাগবে না। তাই তিনি পড়ানোর মাধ্যমটিকে আনন্দময় করে তোলেন। এতে করে ছাত্রছাত্রীরা অনেক বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে এবং পড়ায় মনোযোগী হয়।

১০. বিভিন্ন বিষয়ে মতামত দিয়ে থাকেন:
একজন আদর্শ শিক্ষক পড়ানোর পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজের সুন্দর মতামত তুলে ধরেন এবং ছাত্রছাত্রীদের ভালো কাজের প্রতি উৎসাহ দেন। প্রতিটি শিক্ষার্থীর সকল মতামত ন্যায়সঙ্গতভাবে বিবেচনায় নেন এবং শিক্ষার্থীদের সাথে যথাযথভাবে যোগাযোগ স্থাপন করেন।

১১. নৈতিকতাসম্পন্ন:
ছাত্রছাত্রীরা ছোটকাল থেকেই তার শিক্ষককে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে তাই একজন আদর্শ শিক্ষক নিজেকে উচ্চ নৈতিকতাসম্পন্ন একজন মানুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে থাকেন। এবং ছাত্রছাত্রীদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সবসময় সচেষ্ট থাকেন।

এছাড়াও একজন আদর্শ শিক্ষক হতে হলে কতগুলো অভ্যাস নিজের মাঝে গড়ে তোলে, এগুলোর নিয়মিত চর্চা করা করতে হবে। যেমন- সুন্দর বাচনভঙ্গি, আকর্ষণীয় উপস্থাপন কৌশল, সুনির্দিষ্ট বিষয়ে জ্ঞানের গভীরতা, দূরদর্শী, কৌশলী, কাজের প্রতি ভালোবাসা, বন্ধুবৎসল হওয়া, অন্যের মতামতের প্রতি গুরুত্ব দেয়া, ভালো শ্রোতা হওয়া, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও আদর্শবোধে উজ্জীবিত হওয়া, সহনশীলতা, পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব, ক্ষমাশীল, কর্তব্যনিষ্ঠ এবং সহকর্মীদের প্রতি সহনশীল ইত্যাদি।

0 Comments