হাইব্রিড নেতাদের প্রোফাইল তৈরি করছে গোয়েন্দারা


হাইব্রিড নেতাদের প্রোফাইল তৈরি করছে গোয়েন্দারা 


গত ১০ বছরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং দলটির সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোয় যেসব ‘অতিথি নেতাকর্মী’ ঢুকে পড়েছেন তাদের তালিকা তৈরির নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত মঙ্গলবার রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে এক অনির্ধারিত বৈঠকে তিনি এ নির্দেশনা দেন। নির্দেশনা পেয়ে এসব ‘হাইব্রিড নেতার’ প্রোফাইল তৈরির কাজ শুরুও করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা।
সম্প্রতি ক্যাসিনো ও টেন্ডারবাজদের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযানে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা ‘হাইব্রিড নেতা’ হওয়ায় তাদের মতো আরও কারা দলে ঢুকেছেন সে আলোচনা সামনে এসেছে। কারণ যে সরকারই ক্ষমতায় থাকে এসব লোক তাদের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে দাবড়ে বেড়ান। ঢাকাসহ সারা দেশে আওয়ামী লীগে ঢুকে পড়া এমন কয়েক হাজার ‘হাইব্রিড নেতা’ টেন্ডার ও চাঁদাবাজিসহ নানা ধরনের অপরাধ করছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। সূত্র : দেশ রূপান্তর।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, হাইব্রিড নেতাদের প্রোফাইল তৈরি করে দ্রুত পাঠাতে সারা দেশের পুলিশের সব ইউনিটকে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা কাজ শুরু করে দিয়েছে। পুলিশ ইউনিটগুলোকে ক্ষমতাসীন দলে যেসব হাইব্রিড নেতা ঢুকেছেন তাদের অতীত কর্মকান্ড এবং পরিবার ও স্বজনরা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত কি না বা তারা কী করছে তাও উল্লেখ করতে বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, গত দুদিন আমরা যে তথ্য পেয়েছি তাতে দেখা গেছে, তাদের অনেকে নাশকতা মামলার আসামি। তাদের মধ্যে আছেন বিএনপি-জামায়াত নেতারাও। নিজেদের রক্ষা করতে আওয়ামী লীগেরই একশ্রেণির নেতার সঙ্গে আঁতাত করে তারা দলে ঢুকে টেন্ডারবাজি, অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি ও দখলবাজিসহ নানা অপরাধ করছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) এক কর্মকর্তা বলেন, গত মঙ্গলবার রাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানদের বৈঠক হয় তখন তিনি হাইব্রিড নেতাদের কথা একাধিকবার বলেছেন। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর একশনে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, হাইব্রিডদের কারণে ত্যাগী নেতারা কোণঠাসা। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, হাইব্রিড নেতাদের বেশি লালন-পালন করেন আওয়ামী লীগ বা যুবলীগেরই শীর্ষ নেতারা। মূলত তাদের আশকারা পেয়েই তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন।




সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে বিএনপি-জামায়াতের অনেকে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। তাছাড়া দল ভারী করতে সংসদ সদস্য পদে আওয়ামী লীগের অনেক প্রার্থী ও নেতা তাদের দলে যোগদানে উৎসাহিত করেছেন। কোথাও কোথাও ‘নব্য’ আওয়ামী লীগারদের কারণে ত্যাগী নেতাকর্মীরা কোণঠাসা হয়ে থাকছেন এবং প্রতিনিয়ত হামলা বা মামলার শিকার হচ্ছেন। আওয়ামী লীগের মূলধারার বাইরে থেকে মনোনয়ন নিয়ে যারা সংসদ সদস্য হয়েছেন তারা বিভিন্ন দল থেকে লোক এনে দলের ভেতরে আরেকটি দল তৈরি করেছেন। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, টেন্ডারবাজি, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা বিষয় নিয়ে তাদের সঙ্গে মূলধারার নেতাকর্মীদের বিরোধ তৈরি হয়েছে। বিষয়গুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের অবহিত করার পরও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অভিযোগ উঠেছে, দেশের কোথাও কোথাও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা নিজেদের আধিপত্য বাড়াতে বিএনপি-জামায়াতের লোকদের দলে জায়গা দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ ব্যবসা-বাণিজ্য বা অবস্থান টিকিয়ে রাখতে আওয়ামী লীগে আশ্রয় নিয়েছেন। মূলত তারাই নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকান্ড চালিয়ে আসছেন বলে পুলিশ ও র‌্যাবের  কাছে তথ্য এসেছে।




এ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন বলেন, আওয়ামী লীগ বা দলের সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনে ঘাপটি মেরে থাকা অপরাধীদের চিহ্নিত করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কাজ করছে। এই ক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কঠোর। ক্যাসিনো ও টেন্ডারবাজির ঘটনায় আমরা হার্ডলাইনে। ইতিমধ্যে যারা গ্রেপ্তার হয়েছেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ অন্য দল থেকে যুবলীগে এসে অপরাধ কর্মকান্ড চালিয়েছিলেন বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি।
র‌্যাবের এক কর্মকর্তা বলেন, ক্যাসিনোর ঘটনায় গ্রেপ্তার যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া একসময় ফ্রিডম পার্টি করতেন। জাতীয় পার্টির আমলে ছাত্রসমাজের রাজনীতি করতেন তিনি। পরে বিএনপি ক্ষমতায় এলে ওই দলে যোগ দেন। বিএনপি নেতা মির্জা খোকন ছিলেন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের মাধ্যমে সাংগঠনিক পদ বাগিয়ে নেন। এ পদটি নিতে খালেদ অন্তত ৫০ কোটি টাকা খরচ করেছেন বলে আমাদের জানিয়েছেন তিনি।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ঠিকাদার জি কে শামীম একসময় জাতীয় পার্টি এবং তারপর বিএনপি করেছেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সমবায়বিষয়ক সম্পাদক পরিচয়ে টেন্ডারবাজি করে কয়েক হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক লোকমান হোসেন খালেদা জিয়ার আস্থাভাজন ছিলেন। অথচ তিনি গত ১০ বছর আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে আঁতাত করে অর্থ কামিয়েছেন। পাশাপাশি ক্যাসিনো কারবার চালিয়ে শতকোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তাদের মতোই সারা দেশে এসব নেতা ভরপুর।
তিনি আরো বলেন, আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের কারণে তারা বেপরোয়া। অনেকে কারও কারও কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধাও নিয়েছেন। কোনো অভিযান চালাতে গেলেই ওইসব শীর্ষ নেতা তদবির করে বসেন। তথ্যসূত্র : দেশ রূপান্তর

     

0 Comments